বাংলায় ১৬০০ কোটির বিনিয়োগ প্রস্তাব: অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,কলকাতা: সিঙ্গুর থেকে টাটা গোষ্ঠীর বিদায়ের পর বাংলার শিল্পক্ষেত্রে যে দীর্ঘ খরা ও অন্ধকারের সূচনা হয়েছিল, সেই ক্ষত গত দেড় দশকেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি রাজ্য। বাম আমলে ন্যানো কারখানাকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক কর্মসংস্থানের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র আন্দোলনে তা এক ঝটকায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। যদিও সেই জমি আন্দোলনই তাঁকে মহাকরণের সিংহাসনে বসিয়েছিল। তবে বাংলায় ফের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। এবার সিঙ্গুরের সেই ঐতিহাসিক ক্ষত কাটিয়ে নতুন করে শিল্পজোয়ার আনতে কোমর বেঁধে নেমেছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার।
শুক্রবার একাধিক প্রথম সারির বণিকসভাকে নিয়ে আয়োজিত এক মেগা বাণিজ্য সম্মেলনে বাংলায় এক ধাক্কায় ১৬০০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বলে ঘোষণা করলেন রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত আশাবাদী অর্থমন্ত্রীর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য— ‘‘বেঙ্গল ইজ ব্যাক উইথ এ ব্যাং”।
‘অখুশি রাজ্য’ বদলাতে যুদ্ধকালীন তৎপরতা, সরল হচ্ছে ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট
এদিনের শিল্প সম্মেলনে অতীতের খতিয়ান তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত অত্যন্ত অকপটভাবে রাজ্যের বাস্তব চিত্রটি স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন, ‘‘আজকের বাংলায় সাধারণ মানুষ থেকে শিল্পপতি — সবারই কিছু না কিছু অভিযোগ রয়েছে। এ রাজ্যটি কার্যত একটি অখুশি রাজ্যে পরিণত হয়েছিল, যা বদলাতে এখন নতুন সরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করেছে।”
এরপরই শিল্পপতিদের উদ্দেশে সহযোগিতার বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, আসল ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর’ হলেন ব্যবসায়ীরাই, তাঁরাই রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। পাশাপাশি শিল্পমহলের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, শিল্পায়নের স্বার্থে এবার ‘ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট’ (ভূমি ঊর্ধ্বসীমা আইন) সরলীকরণ করতে চলেছে রাজ্য সরকার।
‘বাঙালি ব্যবসা করতে পারে না, এটা ভুল ধারণা’: সঞ্জীব স্যান্যাল
এদিনের সম্মেলনে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা সঞ্জীব স্যান্যাল বাঙালিদের ব্যবসা করার মানসিকতা নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, “বিগত দিনে রাজনীতি এবং ভুল অর্থনীতি এখানকার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে অনেকটাই নামিয়ে দিয়েছে। বাঙালিরা ব্যবসা করতে পারে না, এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। বলা ভালো, বাঙালিরা এতদিন ব্যবসা করতে চায়নি। অথচ ব্যবসা বাঙালির রক্তেই আছে।”
বিনিয়োগের জোয়ার: এক নজরে কোন কোন মেগা প্রজেক্ট আসছে বাংলায়?
নতুন সরকারের প্রথম বড় বাণিজ্য সম্মেলনেই হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল, পিয়ারলেস গ্রুপ, এল অ্যান্ড টি-র মতো কর্পোরেট জায়ান্টরা বাংলায় বিপুল বিনিয়োগের কথা ঘোষণা করেছে:
-
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস: সূত্রের খবর, আসন্ন দুর্গাপূজার আগেই রাজ্যে ৬,০০০ কোটি টাকার একটি বিশাল প্ল্যান্ট তৈরি করতে চলেছে এই সংস্থা।
-
এল অ্যান্ড টি : বাংলায় একটি ৩০ মেগাওয়াটের মেগা ডেটা সেন্টার তৈরি করবে তারা। এর ফলে রাজ্যে প্রায় ২৫,০০০ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের এক বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
-
পিয়ারলেস গ্রুপ: স্বাস্থ্য ও আবাসন ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের ব্লু-প্রিন্ট দিয়েছে এই গ্রুপ।
-
১,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে, যার মধ্যে ৪০০ কোটি টাকা খরচ হবে অত্যাধুনিক ক্যানসার চিকিৎসায়।
-
১৫০ কোটি টাকা খরচ করা হবে বারাসত জেলা হাসপাতালের আধুনিকীকরণে।
-
২০২৯ সালের মধ্যে আবাসন এবং শপিং মল নির্মাণের জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।
-
-
পিডব্লুসি: রাজ্য বাজেটে নতুন সরকারের ঘোষিত ‘সেমিকন্ডাক্টর’ শিল্প নীতির অংশীদার হতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে এই বিশ্বখ্যাত সংস্থা।
শিল্প মহলের মতে, ল্যান্ড সিলিং আইন শিথিল করার ইঙ্গিত এবং এক মঞ্চে এত হাজার কোটির মেগা প্রকল্পের রূপরেখা স্পষ্ট করে দিল যে, বাংলায় বিনিয়োগের বন্ধ দরজা অবশেষে খুলতে চলেছে।
