২০ ঘণ্টা কাজ, পাহারায় পিটবুল, উদ্ধারের পর পুলিশের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়লেন শ্রমিকেরা
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা- অভাবের তাড়নায় বাড়ি ছেড়ে কাজে গিয়েছিলেন ভিন দেশে। কিন্তু যেখানে কাজে গেলেন সেখানে জীবন দুর্বিষহ করে তুলল মালিকপক্ষ। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরে এক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের এক দুর্বিষহ চিত্র ধরা পড়েছে। শ্রমিকদের উদ্ধারের পর এই ঘটনা সামনে এসেছে। কোনও অপরাধ না করেও বন্দীদশা জীবন কাটাচ্ছিলেন শ্রমিকেরা। মাস তিনেক ধরে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন ৬৮ বছর বয়সি মেহেরবান শাহ। তিনি জানতের তার ছোট ছেলে দিলশাদ মহম্মদ মুজ়ফ্ফনগরের এক কারখানায় কাজ করছে। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন, না মারা গিয়েছেন— তার কোনও খবর ছিল না এই হতভাগ্য বাবার কাছে। ২৪ বছর বয়সি দিলশাদ উত্তরপ্রদেশের অমরোহা জেলার বাসিন্দা। নিজেই কাজ খুঁজে পাঁচ মাস আগে বাড়ি ছেড়েছিলেন। প্রথম কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন। তার পর হঠাৎই সব বন্ধ।
মেহেরবানের কথায়, ‘‘আমরা নানা জায়গায় খোঁজ করি। কোথায় কোথায় ও (দিলশাদ) যেতে পারে, কিন্তু কেউ কোনও খবর দিতে পারেনি। আমরা জানতামই না আমার ছেলে বেঁচে আছে কি না। সবটাই উপরওয়ালার উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম।’’ মঙ্গলবার হঠাৎই বেজে ওঠে মেহেরবানের ফোন। বৃদ্ধা দেখেন, ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ছোট ছেলের নাম!
শুধু দিলশাদ একা নন, এমন অন্তত ১১ জন শ্রমিককে সোমবার উদ্ধার করে মুজ়ফ্ফরনগর পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনা প্রথম প্রকাশ্যে আনেন রাজস্থানের জোধপুরের বাসিন্দা বিক্রম। তিনিও মুজ়ফ্ফরনগরের ওই কাগজের থালা-বাটি তৈরি করার কারখানায় কাজ করতেন। বিক্রম ওই কারখানার পাঁচিল টপকে পালিয়ে যায় মালিকের চোখ এড়িয়ে।
গত ২২ জুন কারখানা থেকে পালিয়ে তিনি সোজা আসেন তিতাওয়ী থানায়। সেখানকার অমানবিক ঘটনা পুলিশকে জানান। তাঁর বয়ানের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে এখনও পর্যন্ত ওই কারখানায় কর্মরত ১২ জন শ্রমিককে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে নাবালকও রয়েছে। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কারখানার মালিক অঙ্কিত বালিয়ানের বাবা প্রদীপ এবং সুপারভাইজার শিব ত্যাগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অঙ্কিতের খোঁজ চালাচ্ছে।তিনিই শ্রমিকদের উপর নজরদারি চালাতে নিয়োগ করেছিলেন শিবকে। তিন জনের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা দেড় বছরের বেশি সময় ওই কারখানায় বন্দিদশায় কাটিয়েছেন। মুজ়ফ্ফরনগরের এসএসপি সঞ্জয় বর্মা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভালো মাইনে, বাসস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে
রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড এবং অন্য জনবহুল এলাকা থেকে শ্রমিকদের কারখানায় আনা হত। স্থানীয় শ্রমিক ছাড়াও দেশের ভিন দেশির শ্রমিকেরাও ছিলেন। এর পর কাজে যোগ দেওয়ার পরেই শ্রমিকদের মোবাইল কেড়ে নেওয়া হত। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড-সহ যাবতীয় পরিচয়পত্রও শ্রমিকদের থেকে নিয়ে নিতেন কর্তৃপক্ষ। কারখানা চত্বর ছেড়ে বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। সেই কারণে কর্মরত শ্রমিকেরা বাড়িতে কিছুই জানাতে পারতেন না। পান থেকে চুন খসলেই জুটত মার। শ্রমিকেরা পুলিশকে জানিয়েছে, প্রতিদিন ভোর ৪ টে থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত, প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজ করতে হত। অসুস্থ হলেও রেহাই নেই। যদি কেউ প্রতিবাদ করতেন, তাঁদের লোহার রড মারা হত। উদ্ধারের পর ১২ জন শ্রমিকের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো হয়। সেই রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, শ্রমিকদের কারও শরীরে আঘাতের চিহ্ন, কারও হাড় ভেঙেছে, কারও শরীরে কাটার দাগ। তদন্তকারীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অত্যাচারের জন্য এই নির্মম অবস্থার শিকার শ্রমিকেরা। যাতে কেউ কারখানা থেকে পালাতে না পারে পাহারায় রাখা হয়েছিল পিটবুলকে। ২০ ঘণ্টা কাজ খেতে দেওয়া তুষের রুটি আর অল্প তরকারি। পুলিশের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন শ্রমিকেরা। প্রাথমিকভাবে অনুমান, অপুষ্টিকর খাবার, মাত্রাতিরিক্ত কাজ, ঘুমের অভাব, শারীরিক নির্যাতনের কারণে কয়েকজনের শ্রমিকের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। পুরো ঘটনাটি তদন্তসাপেক্ষ। আগ্রার বাসিন্দা সোনু চৌহান বলেছেন, দু’মাস ধরে ওই কারখানায় কাজ করছিলাম। দৈনিক আট ঘণ্টা ১৪ হাজারের বেতনের লোভ দেখিয়ে কারখানায় কাজের জন্য আনা হয়েছিল। সেই সঙ্গে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু কাজে গিয়ে দেখি শুধু অমানবিক অত্যাচার।
