‘ঐতিহ্যের’ নামে নৃশংসতা: ফারো দ্বীপে তিমি ও ডলফিনের রক্তে লাল হলো সমুদ্র, বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড়
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, টরসভন (ফারো দ্বীপপুঞ্জ): সমুদ্রের নীল জল বুক চিরে রূপ নিয়েছে গাঢ় রক্তে। আর সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শয়ে শয়ে তিমি ও ডলফিনের নিথর দেহ। হাজার বছরের প্রাচীন প্রথা ও উৎসবের নামে সামুদ্রিক প্রাণীদের ওপর এমন নৃশংসতার নারকীয় দৃশ্য ফের দেখা গেল ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ফারো দ্বীপপুঞ্জে। ভাইকিং আমল থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ‘দ্য গ্রাইন্ড’ উৎসবের নামে মাত্র এক দিনেই ৭০৬টি তিমি ও ডলফিনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই লোমহর্ষক ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। অবিলম্বে এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধের দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পশুপ্রেমী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
যেভাবে চলল এই রক্তক্ষয়ী উৎসব:
আন্তর্জাতিক একাধিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ মে ফারো দ্বীপপুঞ্জে এই উৎসব পালিত হয়। সমুদ্রের অগভীর জলে ‘পাইলট তিমি’ এবং ‘হোয়াইট-সিডেড ডলফিন’-এর দল দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটার সময় নৌকো ও জালের সাহায্যে সেগুলোকে তাড়িয়ে তীরের দিকে নিয়ে আসা হয়। এরপর সৈকতে জড়ো হওয়া শত শত মানুষের সামনেই প্রাণীগুলোকে জীবন্ত অবস্থায় ছুরির কোপে খণ্ড খণ্ড করা হয়।
ছুরির আঘাতে ছটফট করতে করতে সমুদ্রের জলেই প্রাণ হারায় অবলা প্রাণীগুলো। এই বীভৎস দৃশ্য দেখার জন্য বড়দের পাশাপাশি ভিড় জমিয়েছিল শিশু-কিশোররাও। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উৎসবের নামে ওই দিন স্কটল্যান্ড থেকে ২০০ মাইল উত্তরে টরসভনে ৪০২টি পাইলট তিমি, স্কালাবোটনুরে ১৬৮টি হোয়াইট-সিডেড ডলফিন এবং হাভালভিকে আরও ১৩২টি ডলফিনসহ মোট ৭০৬টি সামুদ্রিক প্রাণীকে হত্যা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ:
হাজার বছরের পুরনো এই ভাইকিং ঐতিহ্যকে আজকের আধুনিক যুগে ‘সীমাহীন নৃশংসতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।
-
পরিবেশবাদী সংগঠনের তোপ: আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংরক্ষণ সংস্থা ‘সি শেফার্ড’ (Sea Shepherd)-এর পরিচালক ভ্যালেন্টিনা ক্রাস্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বহুবার ইউরোপীয় সরকারগুলোর কাছে এই নারকীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু চিরাচরিত প্রথার দোহাই দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। আজকের পৃথিবীতে এই উৎসবের কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
-
‘পেটা’র বিবৃতি: পশুপ্রেমী সংস্থা ‘পেটা’ (PETA)-র প্রেসিডেন্ট অ্যালিসা অ্যালেন বলেন, “এটি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতার উৎসব। এই বুদ্ধিমান প্রাণীগুলো নিজেদের পরিবারের সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। অথচ উৎসবের নামে এদের পুরো পরিবারকে ধরে এসে নৃশংসভাবে নিধন করা হচ্ছে।”
প্রশাসনের অদ্ভুত যুক্তি ও বিতর্কিত আইন:
তীব্র আন্তর্জাতিক চাপ ও নিন্দার মুখেও নিজেদের অবস্থানে অনড় ফারো দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসন। তাদের দাবি, এই উৎসবের সময় পরিবেশগত ভারসাম্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে তিমি ও ডলফিনের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে রয়েছে, তাই এই শিকারে কোনো ক্ষতি নেই বলে তাদের দাবি।
তবে পরিবেশবাদীদের আরও বেশি চিন্তায় ফেলেছে ফারো দ্বীপপুঞ্জের সংসদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ। দ্বীপপুঞ্জের সংসদ তাদের প্রাণী সুরক্ষা আইন সংশোধন করে ডলফিন সংরক্ষণের আইনি বিধিমালা বাতিল করেছে। ফলস্বরূপ, এই আইনি শিথিলতার সুযোগ নিয়ে প্রতি বছর নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে হাজার হাজার ডলফিন ও তিমিকে। প্রাচীন ঐতিহ্যের মোড়কে আবৃত এই আধুনিক ‘গণহত্যা’ বন্ধে এখন বিশ্বজুড়ে ডেনমার্ক সরকারের ওপর কূটনৈতিক ও সামাজিক চাপ দিন দিন বাড়ছে।
