আজকের দিনেঅন্যান্যবাংলার আয়না

সংসারে অশান্তি ও আর্থিক অনটন? ফলহারিণী কালীপুজোয় দূর হবে সব অশুভ শক্তি!

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, নিউজ ডেস্ক:- বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত হলো জ্যৈষ্ঠ মাসের ‘ফলহারিণী কালীপুজো’। জ্যৈষ্ঠমাসের অমাবস্যা তিথিতে দেবী কালিকা পূজিত হন ফলহারিণী রূপে। জ্যোতিষ বিশারদ পণ্ডিত হিতেন্দ্র কুমার শর্মার মতে, এই পুণ্যতিথিতে নিষ্ঠাভরে দেবীর আরাধনা করলে সংসারে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির অভাব হয় না এবং দেবীর আশীর্বাদে ঘর ধনসম্পদে ভরে ওঠে।

নামের তাৎপর্য

‘ফলহারিণী’ শব্দের অর্থ হলো— যিনি অশুভ ফল হরণ করেন। ভক্তদের বিশ্বাস, এই তিথিতে মায়ের পুজো করলে সমস্ত অশুভ কর্মের ফল নাশ হয় এবং মোক্ষ লাভ ঘটে।

শ্রী রামকৃষ্ণ ও মা সারদার ‘ষোড়শী পূজা’

ফলহারিণী অমাবস্যার ইতিহাস ঘাটলে আমরা সরাসরি পৌঁছে যাব কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে। ১৮৭৩ সালের এই বিশেষ তিথিতেই যুগাবতার শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এক অভূতপূর্ব লীলা রচনা করেছিলেন। তিনি নিজের ধর্মপত্নী মা সারদা দেবীকে জগন্মাতার আসনে বসিয়ে ‘ষোড়শী রূপে’ পুজো করেছিলেন।

নিজের দীর্ঘ সাধনার সমস্ত ফল এবং নিজের জপমালা তিনি মা সারদার চরণে সমর্পণ করেন। নারী জাতিকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসানোর এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল এই ফলহারিণী অমাবস্যাতেই। তাই রামকৃষ্ণ মিশনে এবং সারদা মঠে এই দিনটি অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে উদযাপিত হয়।

প্রসাদে জ্যৈষ্ঠের রকমারি ফল

এই পুজোর প্রধান উপাচার হলো মরশুমি ফল। দেবীর চরণে বিজোড় সংখ্যায় আম, জাম এবং লিচু নিবেদন করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। এই ফলগুলি না পাওয়া গেলে আপেল বা পেয়ারাও উৎসর্গ করা যেতে পারে। এমনকি এই দিনে দেবীকে ফুলের মালার বদলে ফলের মালা দিয়ে সাজানোর এক অনন্য চল রয়েছে।

মনোস্কামনা পূরণের বিশেষ নিয়ম

এই পুজোয় একটি বিশেষ নিয়ম প্রচলিত আছে। নিজের সবচেয়ে প্রিয় ফলটি মা কালীকে উৎসর্গ করে সেটি বাড়িতে এনে রেখে দিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এক বছর সেই ফল খাওয়া যাবে না। এক বছরের মধ্যে মনের ইচ্ছা পূরণ হলে, সেই প্রসাদী ফলটি গঙ্গার পবিত্র জলে বা কোনো নদীর জলে ভাসিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মনোস্কামনা পূরণের আগেই যদি সেই ফল খেয়ে নেওয়া হয়, তবে শুভ ফল প্রাপ্তি হয় না।

সুফল পেতে পুজো ও ব্রতের নিয়মাবলি:

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলহারিণী অমাবস্যায় কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি—

  • মৌনব্রত পালন: এই তিথিতে অনেকে মৌনব্রত পালন করেন। স্নান করার পর থেকে পুজো শেষ না হওয়া পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটে নিষ্ঠার সাথে ব্রত রাখতে হয়।

  • পবিত্র স্নান: অমাবস্যার দিন সকালে গঙ্গা বা যেকোনো পবিত্র জলাশয়ে ডুব দিয়ে স্নান করা অত্যন্ত শুভ।

  • দান-ধ্যান: পুজো শেষে গরিব-দুঃখীদের প্রসাদ ও প্রয়োজনীয় জিনিস দান করলে দেবী অত্যন্ত প্রসন্ন হন। বিশেষ করে শিশুদের পড়াশোনার সামগ্রী দান করলে দ্রুত সুফল মেলে।

  • প্রদীপ প্রজ্বলন: অমাবস্যার সন্ধ্যা থেকে বাড়ির মূল প্রবেশদ্বারে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে হবে। সারারাত সেই প্রদীপ জ্বললে বাড়ি থেকে সমস্ত অশুভ শক্তি বিদায় নেয়।

  • শিবের অভিষেক: মা কালীর পুজো দেওয়ার পাশাপাশি এই দিন দেবাদিদেব মহাদেবকেও পঞ্চামৃত (দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনি) দিয়ে অভিষেক করা উচিত।

  • অশ্বত্থ গাছের পুজো: জন্মকুণ্ডলীতে চন্দ্র বা মঙ্গলের দোষ থাকলে, এই দিন কালো তিল, দুধ ও গঙ্গাজল দিয়ে অশ্বত্থ গাছের পুজো করলে গ্রহদোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

ভক্তি, নিষ্ঠা এবং সঠিক নিয়ম মেনে ফলহারিণী কালীপুজো করলে মানুষের জীবনের সব অন্ধকার দূর হয়ে শুভ শক্তির উদয় হয় বলেই সনাতন ধর্মে বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *