৬০ বছরে একবার! বিরল যোগে’ জাগ্রত কৈলাস, মিলবে ১৩ গুণ বেশি পুণ্যের ফল
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,নিউজ ডেস্ক:- কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশ্বের অন্যতম পবিত্র তীর্থযাত্রা। ২০২৬ সাল অর্থাৎ এ বছর এই যাত্রাকে ঘিরে ধর্মপ্রাণ মানুষের উৎসাহ অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ, তিব্বতি ও বৌদ্ধ পঞ্জিকা অনুযায়ী এ বছর একদিকে যেমন ‘ঘোড়া বর্ষ’ (হর্স ইয়ার), তেমনই এটি বিরল ‘অগ্নি-ঘোড়া বর্ষ’ (ফায়ার হর্স ইয়ার)। এই দুইয়ের যুগলবন্দি ঘটে মাত্র ৬০ বছরে একবার। তাই বহু ভক্তের বিশ্বাস, এ বছর কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের আধ্যাত্মিক শক্তি সর্বাধিক প্রখর থাকবে। অনেকেই এই বিশেষ সময়কে ভারতের মহাকুম্ভের সঙ্গে তুলনা করে ‘কৈলাস মহাকুম্ভ’ বলেও উল্লেখ করছেন।
সর্বধর্মের মিলনস্থল পবিত্র কৈলাস
চিনের তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরকে ঘিরেই এই তীর্থযাত্রা। বিভিন্ন ধর্মে এর গুরুত্ব অপরিসীম:
-
হিন্দু ধর্ম: বিশ্বাস করা হয়, কৈলাস পর্বতই দেবোত্তম দেব ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর পরম পবিত্র বাসস্থান।
-
বুদ্ধ ধর্ম: বৌদ্ধদের কাছে এই পর্বত ‘কাং রিনপোচে’ বা ‘অমূল্য তুষাররত্ন’ নামে পূজিত।
-
জৈন ধর্ম: জৈন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, তাঁদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এই পবিত্র ভূমিতেই মোক্ষ লাভ করেছিলেন।
-
বন ধর্ম: প্রাচীন বন ধর্মে কৈলাসকে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়।
৫২ কিলোমিটারের ‘কোরা’ বা পরিক্রমা
এই যাত্রার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ কৈলাস পরিক্রমা, যা স্থানীয়ভাবে ‘কোরা’ নামে পরিচিত। অন্য সাধারণ তীর্থক্ষেত্রের মতো এখানে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হয় না। বরং পবিত্র কৈলাস পর্বতকে পায়ে হেঁটে প্রদক্ষিণ করে ভক্তরা তীর্থ সম্পূর্ণ করেন। সাধারণত এই দুর্গম পরিক্রমা শেষ করতে প্রায় তিন দিন সময় লাগে।
কেন ২০২৬ সালের ‘অগ্নি-ঘোড়া বর্ষ’ এত বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ?
તિব্বতি রাশিচক্রে ১২টি প্রাণী পর্যায়ক্রমে ফিরে আসে, যেখানে ‘ঘোড়া’ হলো শক্তি, সাহস, স্বাধীনতা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতীক। প্রতি ১২ বছরে একবার এই বর্ষ ফিরে আসে (শেষবার এসেছিল ২০১৪-তে, আবার আসবে ২০৩৮-এ)।
তবে এ বছরের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়েছে, কারণ এটি শুধু ঘোড়া বর্ষ নয়, ‘অগ্নি-ঘোড়া বর্ষ’ও। তিব্বতি ও চিনা জ্যোতিষশাস্ত্রে প্রতিটি প্রাণীর সঙ্গে পাঁচটি মৌলিক উপাদান (কাঠ, অগ্নি, মাটি, ধাতু ও জল) যুক্ত হয়। ফলে একই প্রাণী ও উপাদানের এই বিরল যুগলবন্দি ফিরে আসে দীর্ঘ ৬০ বছর অন্তর। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, ‘অগ্নি’ হলো শুদ্ধিকরণ ও নতুন সূচনার প্রতীক, আর ‘ঘোড়া’ গতির প্রতীক। তাই এই সময়কে আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য মহালগ্ন বলে মনে করা হয়।
এক পরিক্রমাতেই ১৩ গুণের পুণ্য!
তিব্বতি বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ ঘোড়া বর্ষে মাত্র একবার কৈলাস পরিক্রমা করলে সাধারণ বছরের ১৩ বার পরিক্রমার সমান পুণ্য লাভ হয়। অর্থাৎ, এ বছর একটি পরিক্রমার আধ্যাত্মিক মূল্য একধাক্কায় ১৩ গুণ বৃদ্ধি পায়।
পাশাপাশি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৫৯০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম স্বাদু জলের হ্রদ ‘মানস সরোবর’-কে নিয়েও রয়েছে বিশেষ মাহাত্ম্য। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই অগ্নি-ঘোড়া বর্ষে মানস সরোবরের পবিত্র জলে স্নান করলে মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের সঞ্চিত পাপ ও সমস্ত নেতিবাচক কর্মফল থেকে চিরতরে মুক্তি মেলে।
একদিকে ১২ বছরের ‘ঘোড়া বর্ষ’ আর অন্যদিকে ৬০ বছরের ‘অগ্নি-ঘোড়া বর্ষ’— এই দুইয়ের মহাযোগের কারণেই ২০২৬ সালের কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা আধ্যাত্মিক অভিযান হিসেবে দেখছেন বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষ।
