Census-Bengal : ডিজিটাল প্রযুক্তিতেই ভরসা; সময়সীমার চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে বাংলায় শুরু হচ্ছে আটকে থাকা জনশুমারি !
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা:- কেন্দ্রের ডেডলাইন মেনে আগামী বছর জুনের মধ্যে সেন্সাসের প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করতে মরিয়া রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। পূর্ববর্তী সরকারের জমানায় গত ১১ মাস কাজ আটকে থাকায় হাতে সময় মাত্র এক বছর। এই পরিস্থিতিতে সময় বেঁধে কাজ শেষ করতে ভোটার তালিকায় ‘সার’ প্রক্রিয়ার পরিকাঠামো এবং বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) ব্যবহারের গুরুতর চিন্তাভাবনা করছে নবান্ন। আগামী ১৬ অগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে প্রথম দফার বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহের কাজ। এবারই প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাইজ়ড পদ্ধতিতে, ‘এইচএলও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন অ্যাপ’-এর মাধ্যমে পরিবারগুলির সংগৃহীত তথ্য সুরক্ষিত রেখে এই জনশুমারি করা হবে।
গত বছর জুনে কেন্দ্রীয় সরকার জনগণনা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দেশের অধিকাংশ রাজ্য কাজ শুরু করে দিলেও, বাংলায় এত দিন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বেশ কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যে হাউস লিস্টিংয়ের তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষও করে ফেলেছে। এই অবস্থায় এ রাজ্যে কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘এনিউমারেটর’ বা গণনাকারীর ভূমিকায় বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) ব্যবহারের প্রস্তাব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ সেন্সাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ব্যবহার করতে নারাজ রাজ্য। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আজ, শুক্রবার নবান্ন সভাঘরে প্রিন্সিপাল সেন্সাস অফিসারদের প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে, যেখানে আনুষ্ঠানিক ভাবে উপস্থিত থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
পশ্চিমবঙ্গের মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ রাজ্যে যেখানে জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি, সেখানে এক একজন এনিউমারেটরের পক্ষে ৮০০ জনের বেশি নাগরিকের তথ্যপঞ্জির ভার দেওয়া সম্ভব নয়। সেন্সাস কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে যেখানে ৩২ লক্ষ এনিউমারেটর প্রয়োজন, সেখানে শুধুমাত্র বাংলাতেই ১ লক্ষ ২৫ হাজার এনিউমারেটর এবং প্রতি ৬ জনের জন্য ১ জন হিসেবে আরও ২১ হাজার সুপারভাইজ়ার প্রয়োজন। রাজ্যে ‘সার’ প্রক্রিয়ায় বিএলও হিসেবে কাজ করা প্রায় এক লক্ষ মানুষের একটা বড় অংশই প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। ফলে তাঁদেরই আবার সেন্সাসের কাজে নামানো হবে কি না, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘ভোট কর্মী ও বিএলও ঐক্য মঞ্চে’র সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জানিয়েছেন যে, বিএলও-রা সার ও ভোটের কাজে ব্যস্ত থাকায় এমনিতেই স্কুলে যেতে পারেননি, এর পর আবার জনগণনায় যুক্ত হলে তাঁরা শিক্ষকতার পেশাটাই ভুলে যাবেন এবং গ্রামীণ স্কুলগুলি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফার এই হাউস লিস্টিংয়ের কাজে গণনাকারীরা ৩৩টি প্রশ্নের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়ির বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করবেন। এর মধ্যে থাকবে বাড়ির অবস্থা, সেটি কত তলা, মাটির নাকি কংক্রিটের, ছাদ ও মেঝে কী দিয়ে তৈরি এবং বাড়িটি বাসস্থান, দোকান নাকি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেই সংক্রান্ত তথ্য। এছাড়াও বাড়িতে পানীয় জল, শৌচাগার, বিদ্যুতের ব্যবস্থা, বাসিন্দারা মালিক নাকি ভাড়াটে, এবং বাড়িতে মোবাইল, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, গাড়ি বা বাইক আছে কি না—সব প্রশ্নেরই উত্তর সংগ্রহ করা হবে, যাতে প্রতিটি পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট চিত্র উঠে আসে। এই কাজে মোবাইল অ্যাপের পাশাপাশি রিয়েল টাইম তদারকির জন্য ‘সেন্সাস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম পোর্টাল’ (সিএমএমএস) এবং উপগ্রহ সহায়ক ম্যাপিংয়ের জন্য ‘হাউস লিস্টিং ব্লক ক্রিয়েটর ওয়েব পোর্টাল’ ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি এবার নাগরিকদের জন্য থাকছে ‘সেলফ এনিউমারেশন’ বা স্ব-গণনার সুযোগ। ১ অগস্ট থেকে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত ইচ্ছুক পরিবারগুলি সরকারি পোর্টাল www.se.census.gov.in-এর মাধ্যমে অনলাইনে তাদের বিবরণ এবং উত্তর নিজে থেকেই জমা দিতে পারবেন।
হাতে সময় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞ বিএলও-দের ওপর ভর করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে চাইছে নবান্ন। তবে একদিকে যেমন দ্রুত কাজ শেষ করার প্রশাসনিক চাপ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই শিক্ষকদের এই কাজে নিয়োজিত করার ফলে স্কুল শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আজ নবান্নের প্রশিক্ষণ শিবিরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত রূপরেখা কী হয় এবং শিক্ষক মহলের এই অসন্তোষ প্রশাসন কীভাবে সামাল দেয়, এখন সেটাই দেখার।
