অনন্যা ব্যানার্জির মুকুন্দপুরের ওয়ার্ড অফিস থেকে উদ্ধার বাক্স ভর্তি টাকা ও খাট-বিছানা
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতা: একদিকে যখন কলকাতা পুরসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘স্বচ্ছ অভিযান’ অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে রাজনৈতিক সৌজন্যের নজির গড়ছিলেন ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়, ঠিক তখনই তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকায় ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক ঘটনা। সোমবার সকালে মুকুন্দপুরে অনন্যার বিলাসবহুল ওয়ার্ড অফিসে আছড়ে পড়ল তীব্র জনরোষ। ভাঙচুরের পাশাপাশি ওই অফিস থেকে বাক্স ভর্তি টাকা, কন্ডোম এবং প্রোমোটারদের কাছ থেকে তোলা আদায়ের ‘রেটচার্ট’ উদ্ধারের ঘটনায় চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়।
বিলাসবহুল অফিসে মেকআপ রুম ও খাটের উপস্থিতি, উদ্ধার টাকা
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এদিন সকালে আছড়ে পড়ে মুকুন্দপুরের ওই তৃণমূল কার্যালয়টিতে। উত্তেজিত জনতা অফিসে ঢুকে আলমারি ভাঙতেই চোখ চড়কগাছ হয়ে যায় সকলের। আলমারি থেকে উদ্ধার হয় বাক্স ভর্তি টাকা, মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় নোট। বাসিন্দাদের অভিযোগ, উত্তেজনা ছড়ানোর আগেই তৃণমূল নেতারা অফিসের সিংহভাগ টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছেন। তবে কেবল টাকাই নয়, সরকারি কার্যালয়ের আদলে তৈরি এই ওয়ার্ড অফিসের অন্দরের বিলাসিতা দেখেও অবাক হয়েছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের দাবি, অফিসের ভেতরে রয়েছে একটি সুসজ্জিত ‘মেকআপ রুম’। এছাড়া উদ্ধার হয়েছে মাইক্রোওয়েভ, ফ্রিজ এবং খাট। একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থেকে কন্ডোম উদ্ধারের ঘটনায় তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে এলাকায়। পাশাপাশি অফিসটি থেকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রীও উদ্ধার হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ।
মিলল প্রোমোটারদের ‘তোলাবাজির রেটচার্ট’
কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এলাকায় সন্ত্রাস চালানো এবং প্রোমোটারদের কাছ থেকে নিয়মিত তোলা আদায়ের ভুরি ভুরি অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। এদিন সেই তোলাবাজির একটি নির্দিষ্ট ‘রেটচার্ট’ বা মূল্যতালিকাও অফিস থেকে উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গেছে। কোন প্রোমোটারের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হবে, তা ওই চার্টে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল বলে দাবি বিক্ষোভকারীদের।
“আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে”, সুর চড়ালেন রুদ্রনীল-রূপা
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসকদলকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। এই প্রসঙ্গে বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ বলেন,“নতুন সরকার রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। নিপীড়িত সাধারণ মানুষকে যাতে আর কষ্ট সহ্য করতে না হয়, সেই বন্দোবস্তই করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূল নেতাদের এই সব অত্যাচার আর চলবে না। তাঁদের বিচার হবে এবং মানুষই সেই বিচার করবেন।” অন্যদিকে, বর্ষীয়ান নেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তৃণমূল নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে যেভাবে ভুরি ভুরি দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে, তা দেখে অত্যন্ত খারাপ লাগছে।
“গোটা পশ্চিমবঙ্গেই তো এসব হচ্ছে”, সাফাই অনন্যার
এদিকে তাঁর কার্যালয় থেকে এই সমস্ত আপত্তিকর জিনিস ও টাকা উদ্ধারের ঘটনাকে একপ্রকার ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের স্বপক্ষে তাঁর বিতর্কিত দাবি,
“অফিসে তো জিনিসপত্র থাকবেই। কিছুদিন আগে ইদ গিয়েছে, তাই জামাকাপড় থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর মধ্যে আমি কোনও অন্যায় দেখছি না। আর গোটা পশ্চিমবঙ্গজুড়েই তো এখন এসব হচ্ছে, আমরা তো রোজই টিভিতে দেখতে পাচ্ছি।” পুরসভার অনুষ্ঠান শেষে যখন রাজনৈতিক সৌজন্যের আবহ তৈরি হচ্ছিল, ঠিক তখনই মুকুন্দপুরের এই ঘটনা এবং কাউন্সিলরের পাল্টা বয়ান কলকাতার রাজনৈতিক উত্তাপকে এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দিল।
