সেলিম-হুমায়ুন বৈঠক ঘিরে বাম শিবিরে ফাটল
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- নিউটাউনের একটি হোটেলে হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ঘিরে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে দল ও বামফ্রন্ট দুই শিবিরেই। শুক্রবারও সিপিএম কর্মী-সমর্থকদের একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সমালোচনার ঝড় থামেনি। এই ইস্যুতে কার্যত আড়াআড়িভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সিপিএম।
বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সিপিএমের তরুণ নেতা শতরূপ ঘোষের অবস্থান। দলের বড় অংশ যখন বৈঠকের বিরোধিতা করছে, তখন সেলিমের পাশে দাঁড়িয়ে শতরূপ বলেছেন, “মমতা ও বিজেপিকে হারাতে যা করার হয় করব। যদি কথা হয়ে থাকে, বেশ হয়েছে। আবার কথা হবে।” অথচ গত ডিসেম্বরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি হুমায়ুন কবীরকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে একটি কটাক্ষমূলক পোস্ট রিপোস্ট করেছিলেন। সেই পোস্টে লেখা ছিল “মুর্শিদাবাদ লোকসভায় বিজেপি মনোনীত প্রার্থী শ্রী হুমায়ুন কবীরকে পদ্মফুল চিহ্নে ভোট দিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী করুন।” এই পুরনো পোস্ট সামনে আসতেই শতরূপের ‘দ্বিচারিতা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে।
এই প্রসঙ্গে তৃণমূল মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীর কটাক্ষ, “বেচারা সেদিন বুঝতে পারেনি। এই পোস্টের দু’মাসের মধ্যেই এই হুমায়ুনকেই ‘আব্বা’ বলে ডাকতে হবে। রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প—তাই আর বেশি কিছু বলব না।” অরূপের অভিযোগ, সিপিএমের দ্বিচারিতা প্রকাশ্যে এসেছে।
বিতর্কে সরাসরি আক্রমণে নেমেছেন বামফ্রন্টের শরিক দলগুলিও। ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় বলেন, “গোপনে প্রেম হয় না। বামফ্রন্টে আলোচনা ছাড়া একা একা এগোনো সন্দেহজনক। সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে কোনও সমঝোতা হতে পারে না।” আরএসপির রাজ্য সম্পাদক তপন হোড়ের বক্তব্য, “সব দলের আলাদা মতাদর্শ আছে। কাউকে অপমান করে, ইনসালটিং টোনে কথা বলা রাজনৈতিক শিক্ষা নয়।”
পাল্টা সেলিম শরিকদের কটাক্ষ করে বলেন, “ফরওয়ার্ড ব্লক-আরএসপি একটু বেসুরো কথা বলে। বেসুরো না বললে বোঝা যাবে কী করে তারা সিপিএম নয়, আলাদা দল।” এই মন্তব্যের পর দুই শরিকই সেলিমকে আরও তীব্রভাবে নিশানা করেন।
এদিকে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন, “সেলিম মরিয়া হয়ে বিধায়ক হতে চাইছেন। শতাংশের হিসাব দেখে নতুন আসন খুঁজছেন, সিপিএম সেটাই বলছে।” প্রবীণ সিপিএম নেতা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্য স্পষ্ট করে বলেন, “সিপিএম কোনও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে জোট করবে না।” সিপিএম নেতা রবীন দেবের দাবি, পার্টির সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনও কথা হয় না এবং রাজ্য সম্পাদকের বক্তব্যই চূড়ান্ত।
বৈঠক নিয়ে ক্ষোভ এতটাই যে ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি ইতিমধ্যেই বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর কাছে নালিশ জানিয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেসও বিতর্কে শামিল। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার সেলিমের মন্তব্যের পাল্টা জবাব দেন গান্ধীমূর্তিতে দাঁড়িয়ে। তিনি বলেন, “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান দিয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ কাম্য নয়।” আরজিকর কাণ্ডে কংগ্রেসের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে সেলিমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সব মিলিয়ে হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠককে কেন্দ্র করে সেলিমের সিদ্ধান্ত বাম রাজনীতিতে নতুন করে টানাপড়েন বাড়াল। এই বিতর্ক বামফ্রন্টের ঐক্যে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন রাজনৈতিক মহলের বড় প্রশ্ন।
