আজকের দিনেবাংলার আয়না

সেবাশ্রয়ে ‘ভুল’ চিকিৎসায় পা হারালেন মহিলা! অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,কলকাতা: হাতুড়ে কিংবা অনভিজ্ঞ পড়ুয়া ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা, রোগীদের মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ বিলি— ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেবাশ্রয়’ ক্যাম্পের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা এহেন একাধিক অভিযোগ এবার মারাত্মক রূপ নিল। চিকিৎসা পরিষেবার আশায় সেবাশ্রয়ে গিয়ে ভুল চিকিৎসার জেরে এক পা খোয়াতে হলো দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক অসহায় মহিলাকে। এই মর্মান্তিক পরিণতির বিচার চেয়ে খোদ তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী মহিলা। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটতেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক শোরগোল।

হাঁটু ব্যথা সারাতে গিয়ে পা বাদ!

আক্রান্ত মহিলার নাম মালতী বিশ্বাস, তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনার আক্রার বাসিন্দা। অভিযোগ পত্রে তিনি জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে তীব্র হাঁটু ব্যথা নিয়ে তিনি ডায়মন্ড হারবারের ওই সেবাশ্রয় ক্যাম্পে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাঁকে বেশ কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ, সেই ওষুধ খাওয়ার পর থেকেই তাঁর হাঁটুর ব্যথা কমার বদলে মারাত্মক রূপ ধারণ করে।

যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি পুনরায় সেবাশ্রয় ক্যাম্পে গেলে, চিকিৎসকরা তাঁকে এমআর বাঙুর হাসপাতালে রেফার করে দেন। মালতী দেবীর পরিবারের দাবি, এমআর বাঙুর হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে সাফ জানান যে, ভুল চিকিৎসার কারণেই পায়ের অবস্থা এতটা আশঙ্কাজনক হয়েছে। পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় সেখান থেকে তাঁকে পার্কসার্কাস চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে এবং পরিশেষে চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে রেফার করা হয়। কিন্তু একের পর এক হাসপাতালে ‘রেফার রোগে’র চক্করে পড়ে দিনের পর দিন চিকিৎসা বিলম্বিত হতে থাকে এবং পচন ধরায় শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করে বৃদ্ধার একটি পা কেটে বাদ দিতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা।

অভিষেক ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগ

পরিবারের আরও অভিযোগ, এই চরম পরিণতির পর তাঁরা বহুবার সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সেবাশ্রয় ক্যাম্পের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয় এবং কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। রাজ্যে পালাবদল ঘটতেই অবশেষে সুবিচারের আশায় পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন অসহায় মালতী বিশ্বাস ও তাঁর পরিবার।

আগে থেকেই সরব বিজেপি, প্রকাশ্যে চাঞ্চল্যকর প্রেসক্রিপশন

সেবাশ্রয়ের এই পরিষেবা ও পরিকাঠামো নিয়ে আগে থেকেই একাধিকবার সরব হয়েছিলেন বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস। তাঁর স্পষ্ট দাবি ছিল, “সেবাশ্রয়ের নামে ডায়মন্ড হারবারের মানুষকে আসলে ‘টুপি’ পরিয়েছেন অভিষেক।”বিজেপি নেতার আনা গুরুতর অভিযোগগুলি হলো:

  • হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা: সেবাশ্রয় ক্যাম্পে কোনো স্বীকৃত বা রেজিস্টার্ড অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার থাকতেন না। সেখানে হাতুড়ে ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের দিয়ে জোর করে মডার্ন মেডিসিনের চিকিৎসা করানো হতো, যাঁদের কোনো বৈধ রেজিস্ট্রেশন নম্বরই ছিল না।

  • ত্রুটিপূর্ণ প্রেসক্রিপশন: বিজেপি নেতার প্রকাশ করা একটি প্রেসক্রিপশনে দেখা গেছে, সেখানে রোগীর নাম-বয়স লেখা থাকলেও কোনো রোগের বিবরণ নেই। শুধু লেখা রয়েছে, ‘রেফার্ড টু হসপিটাল’। এমনকি চিকিৎসকের কোনো সই বা রেজিস্ট্রেশন নম্বরও সেখানে অনুপস্থিত।

  • অবৈধ ইউএসজি মেশিন: আইন অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন ব্যবহারের জন্য যে সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়, সেবাশ্রয় কর্তৃপক্ষ তা নেয়নি।

  • জোর করে ভিড় জমানো: ক্যাম্প সফল তা প্রমাণ করার জন্য এলাকার সাধারণ মানুষকে জোর করে ধরে এনে সেখানে ভিড় বাড়ানো হতো। এছাড়া ওষুধের গুণমান এবং মেয়াদ নিয়েও আগে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

ইতিমধ্যেই এই সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগের কপি ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার এসপি-র কাছেও পাঠিয়েছিলেন ওই বিজেপি নেতা। আর এবার সেই সমস্ত অভিযোগের ‘জলজ্যান্ত প্রমাণ’ হিসেবে সামনে এলো মালতী বিশ্বাসের পা বাদ যাওয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনা। এই নিয়ে রবীন্দ্রনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হওয়াতে স্বভাবতই বেশ চাপে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ ও সেবাশ্রয় কর্তৃপক্ষ। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *