শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায়, মন্ত্রীত্ব থেকে কেন বাদ ৪ তারকা বিধায়ক!
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতা: টলিউডের অন্দরে চলমান অস্থিরতা কাটার কোনো লক্ষণ নেই। একের পর এক গিল্ডে প্রকাশ্যে আসছে মতবিরোধ, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। ম্যানেজার গিল্ড থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর্স গিল্ড— সর্বত্রই চলছে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পালা। এই আবহে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘ইম্পা’ । সংগঠনের প্রকৃত সভাপতি কে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম জটিলতা। শতদীপ সাহার দাবি, রতন সাহা নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন; অন্যদিকে পিয়া সেনগুপ্ত শিবিরের বক্তব্য, বর্তমান কমিটির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বহাল রয়েছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানোয় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বিচারাধীন অবস্থায় কীভাবে নতুন সভাপতির ঘোষণা সম্ভব হলো?
স্টুডিয়োপাড়ার কাজের পরিবেশ নিয়ে শিল্পী, কলাকুশলী এবং টেকনিশিয়ানদের একাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ জমছিল। অভিযোগ ছিল, ইন্ডাস্ট্রির একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ধীরে ধীরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, যার ফলে কাজ পাওয়ার সুযোগ থেকে শুরু করে পেশাগত ভবিষ্যৎ পর্যন্ত সবকিছুর ওপর এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছিল।
ড্যামেজ কন্ট্রোলে চার তারকা বিধায়ক: ব্রাত্য শর্বরী
এই টানাপড়েনের আবহে টলিউডে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে এবং ইন্ডাস্ট্রির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ‘থ্রেট কালচার’-এর প্রকৃত চিত্র জানতে এক বিশেষ উদ্যোগ নেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি চার তারকা বিধায়ক— পাপিয়া অধিকারী, রুদ্রনীল ঘোষ, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল গঠন করেন। তবে শুরু থেকেই এই কমিটিতে জায়গা হয়নি শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের।
এই চার বিধায়ক ধারাবাহিক যোগাযোগ রাখছিলেন শিল্পের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে। রুদ্রনীল ঘোষ একাধিকবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে গিয়ে অভিযোগ শুনে বিস্তারিত নথি তৈরি করেছেন। পাপিয়া অধিকারীও বৈঠক করেছেন কাজ হারানো বা কার্যত ‘ব্যানড’ হওয়া শিল্পীদের সঙ্গে। অন্যদিকে, তথ্য ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলানো হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে তাঁর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট জানান, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের আওতা অনেক বড়, চলচ্চিত্র তার একটা অংশ মাত্র। তিনি তাঁর সমস্ত উপলব্ধি ও সংগৃহীত তথ্য সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী এবং নির্দিষ্ট মহলে পৌঁছে দিয়েছেন।
মন্ত্রিসভার মেগা সম্প্রসারণ: রাজভবনে শপথ ৩৫ মন্ত্রীর
এমন এক আবহের মধ্যেই সোমবার বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে গঠিত রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ ঘিরে ছিল প্রবল উৎসাহ। লোক ভবনে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে আরও ৩৫ জন নতুন মন্ত্রী শপথ নিলেন। রাজ্যপাল আর এন রবি তাঁদের পদের এবং গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ করান। নতুন মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ১৩ জন পূর্ণমন্ত্রী, ৩ জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী।
সব পেয়েও কেন ‘মন্ত্রী’ হলেন না টলিপাড়ার তারকারা?
এত বড় রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের পরেও রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে অন্য একটি বিষয়। শুভেন্দু অধিকারীর এই মেগা মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন না টলিউড থেকে উঠে আসা চার পরিচিত মুখ— রুদ্রনীল, পাপিয়া, রূপা কিংবা হিরণ। এমনকি লোক ভবনের অনুষ্ঠানেও তাঁদের কাউকেই বিশেষভাবে দেখা যায়নি। টলিউডের সমস্যা সমাধানে এত সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার পরও কেন এই চার বিধায়ক ব্রাত্য রইলেন?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতায়। আগের সরকারের আমলে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর এবং ফেডারেশনের নেতৃত্বকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক, তোলাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের যে ‘থ্রেট কালচার’ তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও রয়ে গিয়েছে। ফলে, নতুন সরকার শুরু থেকেই সম্পূর্ণ অন্য পথে হাঁটতে চাইছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে:
টলিউডের চারজন পরিচিত মুখের মধ্যে কাউকে মন্ত্রী করা হলে শিল্পের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী রাজনীতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। বরং সরকার চাইছে বিনোদন জগতের দেখভালের দায়িত্ব এমন কারও হাতে থাকুক, যিনি সরাসরি চলচ্চিত্র জগতের অংশ নন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সহজ হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এই চার তারকা বিধায়কের ভূমিকা শেষ হয়ে গেল। সংস্কৃতি সংক্রান্ত পরামর্শ ও বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতেও তাঁদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করতে পারে সরকার। আপাতত সবার নজর আগামী বুধবারের দিকে, যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রক বণ্টন করা হবে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কার হাতে যায়— সেটাই এখন দেখার।
