মাত্র এক মাসেই অতিরিক্ত ১,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় বিজেপি সরকারের
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতা: নতুন সরকারের প্রথম বাজেট পেশের পর থেকেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছিলেন— মাথায় বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ে পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের এত বড় বড় খয়রাতি কীভাবে সম্ভব? কোথা থেকে আসবে এত টাকা? অবশেষে সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং অর্থ দপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে নিয়ে এলো। দেখা যাচ্ছে, বিগত সরকারের আমলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির যে ‘ছিদ্র’ তৈরি হয়েছিল, তা বন্ধ করতেই মাত্র এক মাসের মধ্যে রাজ্যের রাজস্ব আদায় গত বছরের তুলনায় এক ধাক্কায় ১ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গিয়েছে।
বীরভূমের পাথর খাদান ও ‘ভাইপো’র তত্ত্ব
বাজেটের জবাবি ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে চুরির খতিয়ান পেশ করে একপ্রকার হইচই ফেলে দিয়েছেন। তিনি জানান: “বীরভূমের পাথর থেকে একবছরে আগে মাত্র আট কোটি টাকা পেত সরকার। বাকি টাকা যেত ক্যামাক স্ট্রিট হয়ে দুবাই। আর আমরা ক্ষমতায় এসে সততার সঙ্গে কাজ করায় মাত্র এক মাসেই পেয়েছি ৮৩ কোটি টাকা। তার মানে ভাইপো একাই বছরে ১১০০ কোটি টাকা চুরি করত!” নবান্ন সূত্রের খবর, বীরভূমের একটি নির্দিষ্ট পাথর খাদান থেকে যেখানে আগে বছরে মাত্র ৬০ কোটি টাকা রাজস্ব মিলত, এখন বর্তমান সরকারের কড়া নজরদারিতে সেই খাদান থেকেই প্রতি মাসে কোষাগারে আসছে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, আগে যা বছরে আসত, এখন এক মাসেই তার থেকে বেশি টাকা সরকারি তহবিলে জমা পড়ছে।
১,০০০ কোটির ম্যাজিক ও নতুন রাজস্বের উৎস
গত ৯ মে নতুন সরকার গঠনের পর ৯ জুন পর্যন্ত, অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই সরকারের রাজস্ব আদায় গত আর্থিক বছরের ঠিক একই সময়সীমার তুলনায় ১ হাজার কোটি টাকা বেশি হয়েছে। তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার মূলত জমি কেনাবেচার রেজিস্ট্রি এবং আবগারি দপ্তরের (মদ) আয়ের ওপরই বেশি নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলে আয়ের একাধিক নতুন পথ খুলে গিয়েছে। বালি, কয়লা ও পাথর খাদানের মতো ক্ষেত্রগুলি— যেগুলিতে সবচেয়ে বেশি কারচুপি হতো এবং যা বর্তমানে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তাধীন— সেই সমস্ত জায়গায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বা ‘জল গলে যাওয়ার পথ’ বন্ধ হতেই কোষাগার ভরে উঠছে বলে অর্থ দপ্তর সূত্রে খবর।
শ্বেতপত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নবান্নে
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় বুক চিতিয়ে জানিয়েছেন, বিগত সরকারের এই রাজস্ব লুঠের পেছনে রাজনীতি ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের গভীর আঁতাত ছিল। কোন কোন ক্ষেত্র থেকে বানের জলের মতো সরকারি অর্থ এতদিন লোপাট হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের সামনে আনতে ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই এই শ্বেতপত্র তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার নবান্নে এই নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রাজস্ব ফাঁকির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হয়েছে।
‘লৌহবাসরের ছিদ্র’ ও ইলেক্টোরাল বন্ডের খাঁড়া
সাবেক তৃণমূল সরকার দাবি করত, অনলাইন টেন্ডার ও সম্পত্তির রেজিস্ট্রিতে ডিজিটাইজেশন করার ফলে বাম আমলের দুর্নীতি আটকানো গিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, বেহুলা-লখিন্দরের লৌহবাসরের ছিদ্রের মতোই আধুনিক প্রযুক্তির ভেতরেই সুক্ষ্ম ফাঁক রেখে প্রতি বছর বিপুল টাকা চুরি করা হয়েছে।
পাশাপাশি, ইডি তদন্তে নামার পর এবার নজরে এসেছে তৃণমূলের ইলেক্টোরাল বন্ডও। অভিযোগ, এই রাজস্ব ফাঁকির একটি বড় অংশ বন্ডের মাধ্যমে তৎকালীন শাসকদলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢোকানো হয়েছিল। আর এই আর্থিক অসঙ্গতির জেরেই বর্তমানে সেই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে।
অর্থ দপ্তরের এক পদস্থ কর্তার কথায়, “বাজেটের খরচের হিসাব মেলাতে যে রাজ্যকে অলৌকিক কিছু করতে হবে তা নয়। এখন হাতেনাতে প্রমাণ মিলছে যে, শুধুমাত্র চুরি আর দুর্নীতি আটকানো গেলেই রাজ্যের উন্নয়নের জন্য অর্থের জোগান কোনোদিনই বাধা হবে না।”
