নারীবিদ্বেষের অভিযোগ !কল্যাণের বিরুদ্ধে স্পিকারের দ্বারস্থ কাকলি
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতা:- তৃণমূলের অন্দরে সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যকার বিরোধ চরম রূপ ধারণ করেছে। সম্প্রতি কাকলিকে লোকসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতকের পদ থেকে সরিয়ে ফের শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই পুরনো দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর পর থেকেই দলের সঙ্গে কাকলির সংঘাত বাড়তে থাকে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে কাকলি লেখেন, “৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।” এরপর একে একে তিনি দলের সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দেন:
রবিবার তিনি বারাসত সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন । আর তারপর বুধবার তৃণমূল মহিলা কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন-সহ সমস্ত সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে চিঠি পাঠান কাকলি।
লোকসভার স্পিকারকে কাকলির চিঠি ও হেনস্থার অভিযোগ
বুধবার কাকলি ঘোষ দস্তিদার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লোকসভার ভেতরে বার বার মৌখিক হেনস্থা এবং নারীবিদ্বেষী মনোভাবের অভিযোগ এনেছেন। কল্যাণের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে অভিযোগ দায়ের করার জন্য স্পিকারের অনুমতি চেয়েছেন বারাসতের এই সাংসদ। রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে কারণ স্পিকারের সঙ্গে কল্যাণের সম্পর্ক বরাবরই ভালো।
সুব্রত বক্সীকে লেখা চিঠিতে দুর্নীতির খতিয়ান ও ক্ষোভ
তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে লেখা ইস্তফাপত্রে কাকলি নিজের বিবেক দংশন এবং দলের ভেতরের একাধিক ইস্যু নিয়ে সরব হয়েছেন:
-
দুর্নীতি ও আরজি কর কাণ্ড: রেশন দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসক তরুণীর ধর্ষণ-খুনের ঘটনা ও তা ‘ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ’ তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে বলে জানান।
-
কল্যাণকে নিশানা: নাম না করে তিনি লেখেন, “যে পদে থাকাকালীন মহিলা সাংসদের উপর অন্য এক জন অশিক্ষিত, অভদ্র দলীয় সাংসদের অশালীন আচরণ বন্ধ করা যায় না বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সহযোগিতা সহানুভূতি পাওয়া যায় না, সে পদে থাকার মানে হয় না।”
-
আই-প্যাক (I-PAC) বিরোধী ক্ষোভ: দলের ভোট পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিধানসভা নির্বাচনে দলের খারাপ ফলের পেছনেও এই সংস্থার ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
কাকলি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি এখন থেকে শুধুই তৃণমূলের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে থাকবেন।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা আক্রমণ
কাকলির সমস্ত অভিযোগের জবাবে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মনে করিয়ে দেন যে ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত (মাঝের কয়েক মাস বাদে) তিনিই সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতক ছিলেন। কাকলিকে তীব্র কটাক্ষ করে তিনি বলেন:
-
নারদ কাণ্ড: “নারদে তো আমি পাঁচ লক্ষ টাকা নিইনি। উনি নিয়েছেন।”
-
সিন্ডিকেট রাজ: “পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সিন্ডিকেট শব্দের জন্মদাত্রী কে? সকলে জানেন। সেই সিন্ডিকেটের জন্মস্থান রাজারহাট।”
আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ও পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং ‘চরিত্রহনন’-এর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ছেলে বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদার। তিনি মায়ের নামে কুৎসা রটানোর অভিযোগে কল্যাণের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এদিকে পদত্যাগের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। যদিও কাকলি এটিকে প্রশাসনিক বৈঠক হিসেবেই দেখছেন এবং শুভেন্দু অধিকারীও জানিয়েছেন যে বিজেপি সরকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে ‘বিশেষ বিশেষ সাংসদদের’ বৈঠকে ডাকছে, তবুও রাজনৈতিক মহলে এই নিয়ে নতুন জল্পনা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে কাকলি-কল্যাণ সংঘাত তৃণমূল কংগ্রেসকে এক গভীর অস্বস্তিতে ফেলেছে।
