কমিশনের নতুন ফতোয়ায় আতঙ্কে ভোটাররা
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- নির্বাচন কমিশনের একের পর এক নির্দেশে আরও হয়রানির মুখে পড়তে চলেছেন রাজ্যের ভোটাররা। এমনই আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। শুক্রবার রাজ্যের সব জেলাকে পাঠানো কমিশনের নতুন নির্দেশিকা ঘিরে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে প্রশাসনিক মহল ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
কমিশন জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এখন থেকে নির্দিষ্ট ১৩টি নথি ছাড়া ভোটারদের কাছ থেকে অন্য কোনও কাগজ গ্রহণ করা যাবে না। এর মধ্যে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকেও গ্রহণযোগ্য নথি হিসেবে ধরা হয়েছে। কিন্তু সমস্যার শুরু এখানেই শেষ নয়। কমিশন আরও নির্দেশ দিয়েছে যে ইতিমধ্যে যেসব ভোটার শুনানিতে এই ১৩টির বাইরে অন্য নথি জমা দিয়েছেন, তাঁদের নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এই সিদ্ধান্তে ভোটারদের ভোগান্তি যে বহুগুণে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। কারণ, কমিশন যেভাবে বাবা-মায়ের নামের বানানে সামান্য অমিল পেলেই কাউকে ‘সন্দেহজনক ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত করছে, তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমস্যায় পড়তে পারেন। কমিশনের তৈরি করা ইনিউমারেশন ফর্মে যাঁদের আত্মীয়ের নাম উল্লেখ রয়েছে, নির্ধারিত ১৩টি নথি দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক প্রমাণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নদীয়ার বাসিন্দা সঙ্গীতা ব্যানার্জির ঘটনাই জ্বলন্ত উদাহরণ হিসাবে দেখা যাচ্ছে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বাবার নাম ছিল ‘দিলীপ ব্যানার্জি’। কিন্তু ২০২৫ সালের তালিকায় সেটি হয়ে যায় ‘দিলীপ কুমার ব্যানার্জি’। এই নামের অমিলের কারণেই তাঁকে সন্দেহজনক ভোটার হিসেবে শুনানির ডাক দেওয়া হয়। শুনানিতে তিনি মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট ও জন্ম শংসাপত্র জমা দেন, যেখানে বাবার নাম লেখা রয়েছে ‘দিলীপ কুমার ব্যানার্জি’। কিন্তু এই দুই নথি দিয়েও কীভাবে প্রমাণ হবে যে, ২০০২ সালের তালিকার দিলীপ ব্যানার্জি এবং বর্তমান নথির দিলীপ কুমার ব্যানার্জি একই ব্যক্তি, সেই প্রশ্নের উত্তর কমিশনের নির্দেশিকায় নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের নিয়মের ফলে সাধারণ মানুষ কার্যত অসহায় হয়ে পড়বেন। অনেক ভোটার আছেন, যাঁদের কাছে কমিশন নির্ধারিত ১৩টি নথি নেই। তাঁরা ২০০২ সালের তালিকায় উল্লিখিত বাবা-মায়ের পরিচয় প্রমাণ করতে আদালতের হলফনামা, শিক্ষা সংসদ থেকে পাওয়া অষ্টম শ্রেণি পাশের শংসাপত্রের মতো নথি জমা দিয়েছিলেন। নতুন নির্দেশিকার ফলে সেই ভোটারদের নামও বাদ যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হল, সন্দেহজনক ভোটারদের ক্ষেত্রে কোন কোন নথি সংগ্রহ করতে হবে সে বিষয়ে আগে এইআরওদের কোনও স্পষ্ট লিখিত নির্দেশিকা দেয়নি কমিশন। এইআরওদের একাধিক সংগঠন বারবার চিঠি পাঠালেও কমিশনের তরফে কোনও উত্তর মেলেনি বলে অভিযোগ। এসআইআর নির্দেশিকা জারি হওয়ার সময় যে নথির কথা বলা হয়েছিল, তা মূলত আনম্যাপড ভোটারদের জন্য ছিল। কিন্তু খসড়া তালিকা প্রকাশের আগে একটি রহস্যজনক এআই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ চিহ্নিত করে নতুন করে অনেক ভোটারকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেক্ষেত্রেও ‘শুধু ওই ১৩টি নথিই প্রযোজ্য’—এমন কোনও লিখিত নির্দেশিকা কমিশন দেয়নি বলে অভিযোগ এইআরওদের। ফলে প্রশ্ন উঠছেই কমিশনের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের মাশুল সাধারণ ভোটারকেই বা কেন বারবার দিতে হবে? আর এই প্রশ্ন শুধু হয়রানির নয়, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
