আজকের দিনেসুস্থ থাকুন

রক্ত থেকেই তৈরি হবে ডিম্বাণু! মা হওয়া হবে আরও সহজ, দূর হবে বন্ধ্যাত্ব

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, নিউজ ডেস্ক: সন্তানজন্মের জন্য কি সত্যিই এবার ফুরিয়ে যাচ্ছে পুরুষ বা নারীর প্রয়োজন? গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে শুক্রাণু বা ডিম্বাণু তৈরির খবর সামনে আসায় অনেকের মনেই এই প্রশ্ন জাগছে। তবে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বিষয়টি তেমন নয়। মূলত বন্ধ্যাত্বের চিরতরে অবসান ঘটাতেই ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকেরা।

এই গবেষণায় এবার এক অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার এক বায়োটেকনোলজি সংস্থা ‘কনসেপশন’-এর গবেষকেরা। তাঁরা নারীর শরীরের রক্তের কোষ থেকে প্রাথমিক স্তরের ডিম্বাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার সফল হলে বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা যেমন সহজ হবে, তেমনই বেশি বয়সে মা হওয়ার ঝুঁকিও একধাক্কায় অনেকটা কমে যাবে।

কী এই ‘ইন ভিট্রো গ্যামেটোজেনেসিস’ এবং কীভাবে তৈরি হলো ডিম্বাণু?

রক্তের কোষ থেকে কৃত্রিম ডিম্বাণু তৈরির এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ইন ভিট্রো গ্যামেটোজেনেসিস’। এটি মূলত মানুষের রক্তের স্টেম কোষ ব্যবহার করে করা হয়েছে। প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:

  • মাতৃকোষ বা স্টেম কোষ তৈরি: গবেষকেরা মানুষের শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তা বিশেষ উপায়ে ‘প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষে’ রূপান্তর করেন। স্টেম কোষ হলো শরীরের আদি কোষ বা মাতৃকোষ, যা থেকে অন্য যেকোনো কোষ তৈরি করা সম্ভব।

  • আইপিএস পদ্ধতি: এই ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের কোষ বা রক্তের নমুনা ব্যবহার করে ‘ইনডিউস্‌ড প্লুরিপোটেন্ট সেল’ বানানো হয়েছে।

  • ডিম্বাণুর প্রাথমিক স্তর: এরপর সেই স্টেম কোষগুলোকে ল্যাবরেটরিতে নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘প্রাইমরডিয়াল জার্ম সেল’-এ পরিণত করা হয়। এই কোষ থেকেই চিকিৎসকেরা প্রাথমিক স্তরের ডিম্বাণু তৈরি করতে সফল হয়েছেন।

এর আগে ২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী কাতসুহিকো হায়াশি ইঁদুরের ওপর এই পরীক্ষা করে সফল হয়েছিলেন। তবে মানুষের ক্ষেত্রে ডিম্বাণুর গঠন ও বিকাশ অত্যন্ত জটিল হওয়ায় এটি তৈরি করা কঠিন ছিল, যা এবার ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানীরা সম্ভব করে দেখিয়েছেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই আবিষ্কারের ৫টি বড় সুবিধা:

১. আইভিএফ চিকিৎসায় চরম স্বস্তি: বর্তমানে টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ চিকিৎসার জন্য নারীর শরীর থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা বেশ কষ্টদায়ক। এর জন্য দিনের পর দিন হরমোন ইনজেকশন দিতে হয়, যার নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। রক্তের কোষ থেকে ডিম্বাণু তৈরি করা গেলে কোনো ইনজেকশন বা আলাদা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়বে না।

২. বেশি বয়সে নিরাপদ মাতৃত্ব: সাধারণত ৩০ বছর পার হওয়ার পর থেকেই নারীর শরীরে ডিম্বাণুর গুণগত মান কমতে থাকে এবং ৪০ পেরোলে তা ‘হাই রিস্ক প্রেগন্যান্সি’ হয়ে দাঁড়ায়। গুণমান ভালো না হলে গর্ভস্থ সন্তানের মধ্যে নানা অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু মায়ের রক্ত থেকে ল্যাবরেটরিতে উর্বর ডিম্বাণু তৈরি করা গেলে বেশি বয়সে মা হওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।

৩. ক্যানসারজয়ীদের মাতৃত্বের স্বপ্নপূরণ: ক্যানসার চিকিৎসার কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির কারণে নারীদের প্রজনন ক্ষমতা বা ডিম্বাণুর সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এই নতুন প্রযুক্তি সফল হলে ক্যানসার সারিয়ে ওঠা বা চিকিৎসাধীন মহিলারাও মাতৃত্বের স্বাদ পাবেন।

৪. বারবার গর্ভপাতের স্থায়ী সমাধান: অনেক সময় ডিম্বাণুর ভেতরের ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে ভ্রূণ ঠিকমতো বাড়তে পারে না এবং বারবার গর্ভপাত (Miscarriage) হয়। রক্তের কোষ থেকে উর্বর ডিম্বাণু তৈরি করা গেলে এই গর্ভপাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।

৫. সমকামী দম্পতিদের নিজেদের সন্তান লাভের আশা: বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে সমকামী দম্পতিরা নিজেদের রক্তের সম্পর্কযুক্ত সন্তান লাভ করতে পারবেন। একজনের রক্তের কোষ থেকে ডিম্বাণু এবং অন্যজনের কোষ থেকে শুক্রাণু তৈরি করে ল্যাবরেটরিতেই ভ্রূণ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

 এই গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। রক্তের কোষ থেকে তৈরি এই কৃত্রিম ডিম্বাণুগুলি নিষিক্ত (Fertilize) হওয়ার সম্ভাবনা কতটা এবং এর মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তানের জন্ম দেওয়া সম্ভব কি না— তা জানতে আরও বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *