এবার ‘আসল’ তৃণমূলের বৈঠকে কাউন্সিলরদের দিয়ে কোর্ট পেপারে সই ও ভিডিওগ্রাফি
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,কলকাতা: বিধানসভায় বিধায়কদের সই জালিয়াতি কাণ্ড নিয়ে এই মুহূর্তে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। তদন্তে নেমে সিআইডি ইতিমধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ থেকে শুরু করে মদন মিত্রের মতো একাধিক নেতার দুয়ারে কড়া নেড়েছে। আর এই আবহেই চরম সতর্ক পদক্ষেপ করল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেস। সই জালিয়াতির মতো আইনি জটিলতা এড়াতে এবার দলের বৈঠকে উপস্থিত জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘কোর্ট পেপারে’ সই করিয়ে নেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটল নিউটাউনের পাঁচতারা হোটেলে।
নিউটাউনের গোপন বৈঠক: হাজির কলকাতার একগুচ্ছ কাউন্সিলর
সোমবার নিউটাউনের একটি অভিজাত পাঁচতারা হোটেলে বিশেষ অধিবেশনে বসেছিল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেস। সূত্রের খবর, দুপুরের পর থেকেই কলকাতা পুরনিগমের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন কাউন্সিলর ওই হোটেলে পৌঁছাতে শুরু করেন। হাজির ছিলেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র তথা হেভিওয়েট বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম, বিধায়ক জাভেদ খান, কাউন্সিলর জুঁই বিশ্বাস এবং কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক চেনা মুখ। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও এই শিবিরে যোগ দেওয়া বেশ কয়েকজন বিধায়কও এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
নজিরবিহীন কৌশল: কোর্ট পেপারে সই ও ভিডিও রেকর্ডিং
বৈঠকের জাঁকজমকের চেয়েও রাজনৈতিক মহলকে সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে ঋতব্রত শিবিরের আইনি সতর্কতা। সূত্রের খবর, বৈঠকে উপস্থিত প্রত্যেক কাউন্সিলর ও নেতা-নেত্রীকে একটি নির্দিষ্ট কোর্ট পেপারে সই করতে বাধ্য করা হয়।
কোর্ট পেপারের বয়ানে কী ছিল? আইনি ওই নথিতে স্পষ্ট বয়ানে লেখা ছিল— বৈঠকে উপস্থিত প্রত্যেকে সম্পূর্ণ নিজেদের স্বেচ্ছায় এবং সজ্ঞানে এখানে এসেছেন। শুধু সই করিয়ে ক্ষান্ত থাকা নয়, গোটা প্রক্রিয়াটির পুঙ্খানুপুঙ্খ ভিডিও রেকর্ডিং করিয়ে রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যাতে কেউ দলবদলের চাপ বা সই জাল করার পাল্টা অভিযোগ তুলতে না পারেন, তার জন্যই এই নিশ্ছিদ্র আইনি রক্ষাকবচ তৈরি করল ঋতব্রত শিবির।
নেপথ্যে সেই ‘সই জালিয়াতি’ কাণ্ড ও তৃণমূলের ভাঙন
ঋতব্রতদের এই অতি-সতর্কতার নেপথ্যে রয়েছে বিধানসভার সেই বিতর্কিত রেজুলিউশন বুক। ছাব্বিশের ভোটের পর কালীঘাট তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম পাঠানো হয়েছিল। সেই রেজুলিউশন বুকে ৭০ জন বিধায়কের সই ছিল। কিন্তু এর পরেই বিস্ফোরক অভিযোগ ওঠে যে, কালীঘাটের ওই বৈঠকে সব বিধায়ক উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সই নথিতে রয়েছে।
এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা এবং উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা সরাসরি স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেন যে, তাঁরা ওই নথিতে স্বাক্ষর করেননি এবং তাঁদের সই জাল করা হয়েছে। এই ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপরই ঋতব্রত ও সন্দীপনকে দল থেকে বহিষ্কার করে কালীঘাট তৃণমূল। মূলত এই সই জালিয়াতি বিতর্ক এবং বহিষ্কারের পর থেকেই তৃণমূল আড়াআড়ি ভাঙতে শুরু করে, যার রেশ ধরে ঋতব্রতরা এখন বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে ‘আসল’ বিরোধী দলের তকমাও ছিনিয়ে নিয়েছেন।
এখন দেখার, এই কোর্ট পেপারের সই ও ভিডিওগ্রাফির মাস্টারস্ট্রোক নির্বাচন কমিশন বা আইনি লড়াইয়ে ঋতব্রতদের কতটা মাইলেজ দেয়।
