চোখের জলে বিদায়! অনীকের শেষযাত্রায় মিশল বাম-ডান-টলিউড
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতা: ছাদ থেকে পড়ে আকস্মিক মৃত্যুর বিভীষিকা পেরিয়ে আজ চিরতরে বিদায় নিলেন বাংলা সিনেমার এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, পরিচালক অনীক দত্ত। আজ, শুক্রবার (২৯ মে, ২০২৬) নন্দন ও এনটি-১ স্টুডিয়ো হয়ে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সম্পন্ন হলো ‘অপরাজিত’ পরিচালকের শেষকৃত্য। তারকা থেকে আমজনতা, রাজনীতিক থেকে শিল্পী— প্রিয় পরিচালকের শেষযাত্রায় এদিন টালিগঞ্জে যেন এক বিষণ্ণতার সুর নামল। অনীকের শেষযাত্রার সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিজেপি বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ এবং রূপা গঙ্গোপাধ্যায়।
নন্দনে শুরু অন্তিম যাত্রা, মেয়ের অপেক্ষায় ছিল দেহ
গত বুধবার সকালে হিন্দুস্তান পার্কের আবাসন থেকে পড়ে মৃত্যু হয় পরিচালকের। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে তাঁর মাথায়, পাঁজরে ও ফুসফুসে গুরুতর আঘাত ও রক্তক্ষরণের কথা জানা গিয়েছে। পুলিশ সূত্রে ছাদ থেকে অনীকের সুইডেনবাসী মেয়ের উদ্দেশ্যে লেখা একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার হয়েছে, যেখানে কাউকে দোষ দেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সুইডেন থেকে কলকাতায় ফেরেন অনীকের কন্যা ঐশী দত্ত। মেয়ে ও প্রাক্তন স্ত্রী সন্ধি দত্ত পিস ওয়ার্ল্ডে গিয়ে দেহ দেখার পর আজ সকালে শেষযাত্রার প্রক্রিয়া শুরু হয়। জীবনের শেষ কয়েক বছরে নন্দনের সঙ্গে পরিচালকের নানা বিতর্ক থাকলেও, আজ সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ জনসাধারণের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য তাঁর মরদেহ প্রথম নিয়ে আসা হয় এই নন্দন প্রাঙ্গণেই।
এনটি-১ স্টুডিয়োয় শোকের আবহ: এক সারিতে সৃজিত, জিৎ ও বিমান বসু
নন্দন থেকে সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ অনীকের নিথর দেহ নিয়ে আসা হয় তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতিবিজড়িত টালিগঞ্জের এনটি-১ স্টুডিয়োর ৩ নম্বর ফ্লোরে। সাদা কাপড়ে মোড়া প্রিয় পরিচালকের দেহ ফুল আর মাল্যে ঢেকে দেন তাঁর সহকর্মীরা।
-
কান্নায় ভাঙলেন সহকর্মীরা: অনীকের মরদেহের মাথার কাছে বসে কেঁদে ফেলেন চৈতালি দাশগুপ্ত। চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি সুদীপ্তা চক্রবর্তী, লগ্নজিতা চক্রবর্তী ও রূপা গঙ্গোপাধ্যায়।
-
বাইরে স্তব্ধ ‘সত্যজিৎ’: অনীকের বিখ্যাত ছবি ‘অপরাজিত’-এ সত্যজিৎ রায়ের অনুপ্রেরণায় তৈরি চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা জীতু কামাল দীর্ঘক্ষণ স্টুডিয়োর বাইরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। ভিতরে না ঢুকেও যেন নিজের মতো করে বিদায় জানালেন মেন্টরকে।
-
যৌথ শ্রদ্ধার্ঘ্য: চলচ্চিত্রে ভিন্ন ধারার দুই নির্মাতা— সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং হরনাথ চক্রবর্তী একসঙ্গে অনীকের দেহে মাল্যদান করেন। শ্রদ্ধা জানান অভিনেতা জিৎ, মনামী ঘোষ, সাহেব ভট্টাচার্য এবং স্ত্রী মৌপিয়াকে সঙ্গে নিয়ে আসা পরিচালক উৎসব মুখোপাধ্যায়।
-
‘আগুনের পরশমণি’ সুরে বিদায়: গৌতম ঘোষ ও ঊষসী চক্রবর্তীদের গলায় ‘আগুনের পরশমণি’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে সুরে কান্নাভেজা পরিবেশে বিদায় জানানো হয় অনীককে।
দলমত নির্বিশেষে শেষ শ্রদ্ধা
ব্যক্তিজীবনে নিজের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে বরাবরই ঠোঁটকাটা ও কুণ্ঠাহীন ছিলেন অনীক দত্ত। আজ তাঁর বিদায়বেলায় রাজনৈতিক রঙ মুছে একসঙ্গে দেখা গেল বাম ও ডান শিবিরের নেতাদের। প্রবীণ বামনেতা বিমান বসু এবং শতরূপ ঘোষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। বিমান বসু আক্ষেপ করে বলেন, “এই সমাজকে ও যা দিতে পারত, তার চেয়ে খুব কমই দিয়ে যেতে পেরেছে। অনীক দত্ত ফর্ম ভাঙত, ফর্ম গড়ত। এই শূন্যতা অপরিসীম।”
পাশাপাশি বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় ও রুদ্রনীল ঘোষও দীর্ঘক্ষণ উপস্থিত ছিলেন পরিচালকের পরিবারের পাশে।
কেওড়াতলায় মহাপ্রস্থান
এনটি-১ স্টুডিয়োর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন পর্ব শেষে বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ অনীক দত্তের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। সেখানেই সম্পন্ন হয় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ কিংবা ‘অপরাজিত’-র মতো কালজয়ী সিনেমা উপহার দেওয়া এই পরিচালকের শারীরিক অবসান ঘটলেও, তাঁর সৃষ্টি ও আপসহীন মনোভাব চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে থেকে যাবে আজীবন।
