আজকের দিনেতিলোত্তমা

অসমে হিমন্ত, বাংলায় কি শুভেন্দু? বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর ‘ডিলিমিটেশন’ মন্তব্যে জল্পনা তুঙ্গে

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতা: লোকসভায় আসন পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে চাপানউতোর দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়মের পাশাপাশি ডিলিমিটেশন বিলটি পেশ করার কথা ভাবলেও, শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্তরে বিষয়টি থমকে থাকলেও, আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে যে বিধানসভার আসন পুনর্বিন্যাস হতে চলেছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলল খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গলায়।

শুক্রবার বিধানসভায় স্পিকার নির্বাচনের পর বক্তব্য রাখার সময় মুখ্যমন্ত্রী যা বললেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী ইঙ্গিত দেন, আগামী দিনে বর্তমান স্পিকারের নেতৃত্বেই হয়তো বিধানসভা ভবনের ভোলবদল করতে হবে, এমনকি তৈরি হতে পারে নতুন ভবনও।

কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী?

ঐতিহাসিক অধিবেশনের সাক্ষী থাকা রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,”আগামী দিনে অনেক সংস্কারের প্রয়োজন আছে। ডিলিমিটেশন হয়ে গেলে হয়তো আসন সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে আমাদের নতুন ভবন তৈরি করার দরকার পড়তে পারে।” বিধানসভা অধিবেশনের শুরুতেই খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মুখে ডিলিমিটেশনের এই উল্লেখ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, আসন পুনর্বিন্যাস বিজেপির পুরনো এজেন্ডা হলেও, এ রাজ্যে গেরুয়া শিবিরের নির্বাচনী সংকল্প পত্রে এর কোনো আনুষ্ঠানিক উল্লেখ ছিল না। ফলে শুভেন্দুর এই মন্তব্য আগামী দিনের এক বড়সড় রাজনৈতিক ব্লুপ্রিন্টের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আইনি পথ কতটা সহজ?

নিয়ম অনুযায়ী, লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের জন্য সংসদের অনুমতির প্রয়োজন হলেও, বিধানসভার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। বিধানসভার আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ পুনর্বিন্যাসের নির্দেশ জারির জন্য লোকসভার অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে না।

  • রাষ্ট্রপতির অনুমতি: রাষ্ট্রপতির সবুজ সংকেত থাকলেই রাজ্য সরকার একটি ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন করতে পারে।

  • সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবিধা: কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে তৈরি বিলটি বিধানসভায় পাশ করিয়ে নিতে হয়। ঘটনাচক্রে, বর্তমানে এ রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের হাতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে আইনি পথে এই পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সরকারের কোনো বেগ পেতে হবে না।

নেপথ্যে কি ‘অসম মডেল’?

মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—তবে কি ২০২৩ সালে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা যে ধাঁচে আসন পুনর্বিন্যাস করিয়েছিলেন, বাংলাতেও সেই একই মডেলের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে?

অসমে ২০২৩ সালের ডিলিমিটেশনের পর বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছিলেন যে, সেখানে সংখ্যালঘু ভোটের রাজনৈতিক গুরুত্ব সুপরিকল্পিতভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে:

  • আগে অসমে প্রায় ৩৫টি আসনে সংখ্যালঘুরা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতেন।

  • পুনর্বিন্যাসের পর সেই আসন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২টিতে

চলতি বছরের অসম বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীরা ওই ২২টি আসনের বাইরে কার্যত কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি, যার সরাসরি সুবিধা পেয়েছে শাসক দল।

বাংলার রাজনীতিতে এর প্রভাব কী?

রাজনৈতিক মহলের মতে, বাংলায় ডিলিমিটেশন হলে শুধু যে আসন সংখ্যা বাড়বে তা নয়, ভৌগোলিক সীমানা পরিবর্তনের কারণে বহু কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভোটব্যাঙ্কের অঙ্ক ওলটপালট হয়ে যাবে। অসমের মতোই কি তবে এখানেও বিরোধী ভোটব্যাঙ্ককে কোণঠাসা করার কৌশল নেওয়া হচ্ছে? শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ আগামী দিনে বাংলার রাজনীতির মোড় কোন দিকে ঘোরায়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *