আজকের দিনেভারত

ধর্ষিতা কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বায় দীর্ঘ সময় সীমা কেন?

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, দিল্লি:- ধর্ষণের ফলে সৃষ্ট ‘অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব’ কারও ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। ১৫ বছরের এক ধর্ষিতা কিশোরীর ৩০ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা শেষ করার অনুমতি সংক্রান্ত মামলায় বৃহস্পতিবার এমনই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, গর্ভপাতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে খোদ নির্যাতিতা এবং তার অভিভাবকরাই। এই স্পর্শকাতর বিষয়ে তাঁদের সঠিক পথ দেখাতে সাহায্য করবেন এইমসের মতো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা। বৃহস্পতিবার একটি মামলার শুনানিতে ঠিক এমনই ইঙ্গিত দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত ।

 দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি রিভিউ পিটিশন বা পুনর্বিবেচনার আবেদন দাখিল করেছে এইমস। হাসপাতালের দাবি, এত দেরিতে গর্ভপাত ওই নাবালিকার জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই জটিল আইনি ও চিকিৎসাগত লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।

এইমসের যুক্তি ও উদ্বেগ

আদালতে এইমস কর্তৃপক্ষের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল:

  • শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি: ৩০ সপ্তাহে গর্ভপাত করলে কিশোরীটির স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। যে বয়সে মেয়েটির পড়াশোনা করার কথা, সেই বয়সে তাকে মা হতে বাধ্য করা অমানবিক। তার শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বিবেচনা করা জরুরি।

  • শিশু বনাম শিশু: হাসপাতালের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, এটি সাধারণ গর্ভাবস্থা নয়; বরং এখানে একজন শিশুর গর্ভে বড় হওয়া অপর একটি ভ্রুণও প্রায় শিশুর আকার নিয়েছে।

  • ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: আদালত জানায়, ১৫ বছরের একটি শিশুর ওপর জোর করে মাতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

  • সিদ্ধান্তের অধিকার: যদি গর্ভপাতের ফলে মায়ের স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল তার পরিবারেরই থাকা উচিত।
  • বিকল্প প্রস্তাব: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দত্তক দেওয়ার মতো বিকল্প পথের ইঙ্গিত দিয়েছিল।

সুপ্রিম কোর্টের অনড় অবস্থান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

রিভিউ পিটিশনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট এইমস-কে বেশ কিছু কড়া নির্দেশ ও পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে:

  • চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরিবারের: আদালত স্পষ্ট করেছে, চিকিৎসকরা কেবল ঝুঁকির দিকগুলি নিয়ে বাবা-মাকে পরামর্শ দেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার কেবল ওই নাবালিকা ও তার পরিবারের।

  • ট্রমার গুরুত্ব: শীর্ষ আদালতের মতে, ধর্ষণের শিকার একটি শিশুর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত ও ট্রমা থাকা স্বাভাবিক। যদি গর্ভপাতের ফলে মায়ের স্থায়ী কোনো শারীরিক অক্ষমতার সম্ভাবনা না থাকে, তবে এই প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া উচিত নয়।

  • পরিবারের সম্মতি: যদি চিকিৎসকদের পরামর্শ শোনার পর পরিবার তাদের মত পরিবর্তন না করে এবং কিশোরী গর্ভপাত করাতেই চায়, তবে তা মেনে নিতে হবে। তবে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত বোঝানোর দায়িত্ব চিকিৎসকদের।

আইন সংশোধন ও দ্রুত বিচারের নির্দেশ

এই মামলার প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও কিছু গুরুতর প্রশ্ন রেখেছে:

  • বিচারের দীর্ঘসূত্রতা: কেন ধর্ষণের শিকার শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার ট্রমা সহ্য করতে হবে?

  • আইন সংশোধন: আদালত কেন্দ্রকে পরামর্শ দিয়েছে যাতে ধর্ষণ মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করা যায়, এমনভাবে আইন সংশোধন করা হোক।

সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, এইমস যদি পরিবারকে বুঝিয়ে তাদের মত পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়, তবেই আদালত বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করবে। অন্যথায়, নির্যাতিতার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও মানসিক স্বাস্থ্যকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *