আজকের দিনেতিলোত্তমা

রাজ্যে আজ থেকেই লাগু কড়া ‘গুন্ডাদমন আইন’!

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতাঃ সোমবার থেকেই পশ্চিমবঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে চলেছে বহুল চর্চিত ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ’ আইন। যা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে সংক্ষেপে ‘গুন্ডাদমন আইন’ নামেই পরিচিত। গত ২৯ জুন রাজ্য বিধানসভায় পাশ হওয়া এই নতুন আইনের ফলে পুলিশ এবং প্রশাসনের হাতে অপরাধ দমনে এক অভূতপূর্ব ও বিপুল ক্ষমতা চলে এলো। তবে এই আইনকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার ‘কালা কানুন’ বলে ইতিমধ্যেই সুর চড়িয়েছে বিরোধী শিবির।

বিনা বিচারে ১ বছর পর্যন্ত আটক!

এই নতুন আইনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও বিতর্কিত দিক হলো আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বা প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন। এবার থেকে রাজ্য সরকার, পুলিশ কমিশনার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা সরকার-নির্ধারিত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা চাইলে যেকোনো চিহ্নিত সমাজবিরোধীকে আগাম আটকের নির্দেশ দিতে পারবেন। কোনো রকম দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ওই ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে। তবে আটক ব্যক্তি চাইলে সরকারের নির্ধারিত বিশেষ কমিটি বা কমিশনে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল জানাতে পারবেন।

কাদের বলা হবে ‘গুন্ডা’? কী এই আইনের পরিধি?

বিলের খসড়ায় ‘গুন্ডা’ শব্দটির একটি সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে— কোনো ব্যক্তি নিজে, অথবা কোনো দল, গ্যাং বা সিন্ডিকেটের সদস্য বা নেতা হিসেবে যদি অভ্যাসগতভাবে সমাজবিরোধী কাজ করে, তবেই তাকে ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। অস্ত্র আইন, মাদক আইন, অনৈতিক পাচার প্রতিরোধ আইন, বিস্ফোরক আইন বা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার গুরুতর ধারায় অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বা যুক্ত থাকার চেষ্টা করলেও এই আইন প্রযুক্ত হবে।

আইনের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি বা নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে, এমন সব কাজই এর আওতাভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে:

  • তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ এবং বেআইনি জমি বা সম্পত্তি দখল।

  • আইনসম্মত ব্যবসা-বাণিজ্য বা পেশায় জোরপূর্বক বাধা দেওয়া।

  • সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর বা ক্ষতিসাধন।

  • বেআইনি বালি, পাথর বা প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন এবং বনজ সম্পদের ক্ষতি করা।

দ্বিগুণ জরিমানা ও ‘বাড়তি দাওয়াই’

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, রাজ্যে বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং তোলাবাজি-সিন্ডিকেট রাজের দাপট কমাতে পুলিশকে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। এই বিল সেই ‘বাড়তি দাওয়াই’ হিসেবেই কাজ করবে। অপরাধের জেরে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান দেখে সরকারের বিশেষ কমিশন চাইলে প্রকৃত ক্ষতিপূরণের চেয়েও দ্বিগুণ ‘দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা’ চাপাতে পারবে অভিযুক্তদের ওপর। অপরাধ ঘটার পর তো বটেই, অপরাধের সামান্যতম সম্ভাবনা বা পুনরাবৃত্তি রোখার জন্যও পুলিশ ও প্রশাসন আগাম কড়া পদক্ষেপ করতে পারবে।

সরব বিরোধীরা: ‘আন্দোলন দমনের অস্ত্র’

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সরকার এই কঠোর পদক্ষেপের কথা বললেও, বিরোধীরা একে মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। বাম ও বিজেপি-সহ বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এই আইন আসলে একটি ‘কালা কানুন’। অপরাধ দমনের নামে আসলে শাসকদল নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা কায়েম রাখতে চাইছে। ভবিষ্যতে সরকারের নীতি বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন হলে, তা দমন করতেই পুলিশকে এই নজিরবিহীন ও স্বৈরাচারী ক্ষমতা দেওয়া হলো বলে দাবি বিরোধীদের।

আইন কার্যকর হওয়ার পর এবার রাজ্যজুড়ে এর প্রয়োগ কীভাবে হয়, এবং তা নিয়ে আগামী দিনে আইনি বা রাজনৈতিক লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *