১০ টাকার ঝালমুড়ি কাড়ল শান্তি! কড়া পুলিশি ঘেরাটোপে বিক্রম
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, ঝাড়গ্রাম: ছিমছাম দোকান। থরে থরে সাজানো মুড়ি আর চানাচুরের প্যাকেট। স্টিলের ডিব্বায় একে একে মুড়ি, বাদাম আর মশলা মিশিয়ে ঝালমুড়ি বানাতে ব্যস্ত এক যুবক। ইনিই ঝাড়গ্রামের রাজ কলেজ মোড়ের ‘চবনলাল স্পেশ্যাল ঝালমুড়ি’র মালিক বিক্রম কুমার সাউ। গত ১৯শে এপ্রিল লোকসভা ভোটপ্রচারে ঝাড়গ্রামে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সড়কপথে ফেরার সময় আচমকাই তাঁর কনভয় দাঁড়ায় বিক্রমের দোকানের সামনে। প্রধানমন্ত্রীর আবদারে তাঁকে ১০ টাকার ঝালমুড়ি বানিয়ে খাইয়েছিলেন এই ছাপোষা যুবক। সেই একটি ঘটনাই রাতারাতি বিক্রমকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিল। ভোটপর্ব মিটেছে, রাজ্যে নতুন সরকারও ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু সেই ১০ টাকার ঝালমুড়ির রেশ এবং আতঙ্ক এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে বিক্রম ও তাঁর পরিবারকে।
কেন নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বিক্রম ?
বর্তমানে ঝাড়গ্রামের কলেজ মোড়ে কুমুদকুমারী ইনস্টিটিউশনের কাছে বিক্রমের দোকানের সামনে সার্বক্ষণিক এক পুলিশকর্মীকে বসে থাকতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, পুলিশের তরফে দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরাও বসানো হয়েছে। দোকানে কোনো গ্রাহক বা অপরিচিত কেউ এলে, ওই পুলিশকর্মীকে সমস্ত তথ্য জানিয়ে তবেই বিক্রমের কাছে পৌঁছানো যায়।
হঠাৎ কেন এই কড়া নিরাপত্তা? বিক্রম নিজেই জানালেন সেই আতঙ্কের কথা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকান থেকে ঝালমুড়ি খেয়ে যাওয়ার পর থেকেই বিক্রমের জীবন ‘অতিষ্ঠ’ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে টেক্সট মেসেজ ও হোয়াটসঅ্যাপে ক্রমাগত তাঁকে খুনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ঝাড়গ্রাম থানায় এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জানানোর পর থেকেই সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকা কালীন পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
‘মোদী দোকানে না আসলেই ভালো হতো’
আদতে বিহারের গয়ার বাসিন্দা সাউ পরিবার গত ২০ বছর ধরে ঝাড়গ্রামে বসবাস করছেন। পরিবারে রয়েছেন বিক্রমের বাবা, মা, স্ত্রী এবং পাঁচ বছরের এক সন্তান। আগে ঠেলাগাড়িতে ঝালমুড়ি বিক্রি করলেও, ব্যাংক থেকে ৫ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে কলেজ মোড়ে এই স্থায়ী দোকানটি করেন বিক্রম। স্মিত হাসির আড়ালে চাপা আতঙ্ক নিয়ে বিক্রম বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যে আমার দোকানে ঝালমুড়ি খেতে আসবেন, তা আমি আগে থেকে কিছুই জানতাম না। হঠাৎ করেই তাঁর কনভয় এসে দাঁড়ায়। মোদীজি যদি আমার দোকানে না আসতেন, তাহলেই হয়তো ভালো হতো। এখন সারাক্ষণ একটা ভয় তাড়া করে বেড়ায়।”
হুমকি ফোনের পাশাপাশি দোকান ও ভাড়াবাড়ির সামনে সারাক্ষণ উৎসুক মানুষের ভিড় লেগে থাকে। তবে মোদীর দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ১০ টাকার নোটটি আজও সযত্নে আলমারিতে রেখে দিয়েছেন বিক্রম।
‘সরকার বদল না হলে বিহারে পালিয়ে যেতে হতো’
প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খাওয়ার পর থেকেই স্থানীয় স্তরে বিক্রমকে ‘বিজেপির লোক’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিক্রমের কথায়, “রাজ্যে যদি এবার সরকার বদল না হতো, তাহলে হয়তো বাধ্য হয়ে এখান থেকে সব কিছু গুটিয়ে আমাদের বিহারে পালিয়ে যেতে হতো।” তবে এই রাজনৈতিক বিষয়ে বিক্রমের বাবা-মা কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
বিক্রমের বাড়ি থেকে ১৫ মিনিট দূরত্বের ভাড়াবাড়ির প্রতিবেশী রুনা ভকত জানান, সাউ পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে এখানে রয়েছেন এবং তাঁরা অত্যন্ত ভালো মানুষ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আসার পর থেকেই পাড়ায় অচেনা লোকজনের আনাগোনা অনেক বেড়ে গেছে। ১০ টাকার ঝালমুড়ি বিক্রমের জীবন রাতারাতি বিখ্যাত করে দিলেও, সেই খ্যাতির সাথে আসা আতঙ্ক এখন ঘুম কেড়েছে গোটা পরিবারের।
