শর্তসাপেক্ষে জামিন পেলেন কবি শ্রীজাত, তবে আদালতের অনুমতি ছাড়া ছাড়তে পারবেন না শহর
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কৃষ্ণনগর: নির্বাচনী আবহের মধ্যেই স্বস্তি পেলেন বিশিষ্ট কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় আট বছর পুরোনো একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতায় শনিবার নদিয়ার কৃষ্ণনগর জেলা আদালতে হাজিরা দেন তিনি। উভয় পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাবে পর অবশেষে শর্তসাপেক্ষে কবির জামিন মঞ্জুর করল আদালত।
তবে জামিন মিললেও আদালতের তরফে কিছু কড়া শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী:
কবিকে ২,০০০ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড জমা দিতে হয়েছে।
আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি কৃষ্ণনগর এবং কলকাতার বাইরে যেতে পারবেন না।
বিতর্কের উৎস: ২০১৭ সালের সেই কবিতা ‘অভিশাপ’
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালে, যখন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগী আদিত্যনাথ শপথ গ্রহণ করেন। সেই সময় কবি শ্রীজাত তাঁর ফেসবুক পেজে ‘অভিশাপ’ নামে একটি কবিতা পোস্ট করেছিলেন। অভিযোগ ওঠে, ওই কবিতার ছত্রে ছত্রে হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা হয়েছে। বিশেষ করে কবিতার একটি লাইনে শিবলিঙ্গকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছিল বলে দাবি করেন আন্দোলনকারীরা।
এই ঘটনার জেরে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে কৃষ্ণনগর আদালতের দ্বারস্থ হন আইনজীবী রোমিত শীল। এর আগেও এই কবিতাটি ঘিরে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল— ফেসবুক থেকে কবিতাটি সরিয়ে নেওয়া, কবিকে প্রাণে মারার হুমকি দেওয়া থেকে শুরু করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির বিক্ষোভ ও এফআইআর, বাদ যায়নি কিছুই।
সমন এড়ানো এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, মামলার প্রেক্ষিতে এর আগে একাধিকবার কবি শ্রীজাতকে সমন পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তিনি আদালতে হাজিরা দেননি। দীর্ঘদিন আদালতের নির্দেশ অমান্য করার কারণে গত ২০ এপ্রিল কৃষ্ণনগর আদালত কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের মুখে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতি এবং সংস্কৃতিমহলে শোরগোল পড়ে যায়। একাংশ নির্বাচনী আবহে এই পদক্ষেপের জন্য নির্বাচন কমিশনের দিকেও আঙুল তোলে। যদিও কমিশন দ্রুত বিবৃতি জারি করে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়।
আদালতে তীব্র সওয়াল-জবাব
শনিবার আদালতে শ্রীজাতর আইনজীবী জামিনের আবেদন জানালে তার তীব্র বিরোধিতা করেন মামলাকারী আইনজীবী রোমিত শীল। তাঁর যুক্তি ছিল, অভিযুক্ত দীর্ঘদিন ধরে আদালতের নির্দেশকে অবজ্ঞা করেছেন, তাই তাঁকে কোনোভাবেই জামিন দেওয়া উচিত নয়। তবে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত শর্তসাপেক্ষে জামিনের আবেদন মঞ্জুর করে।
সংস্কৃতি বনাম ধর্মীয় ভাবাবেগ: দ্বিধাবিভক্ত মহল
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত এপ্রিল মাস থেকেই সাহিত্য ও রাজনৈতিক মহল উত্তপ্ত।
সংস্কৃতিমহলের দাবি: রাজ্যের বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিমহল একযোগে শ্রীজাতর পাশে দাঁড়িয়ে সরব হয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি আসলে শিল্পীর বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ।
বিরোধী পক্ষের দাবি: অন্য অংশের মতে, কোনো প্রগতিশীলতার নামেই অন্য কোনো ধর্মের বা কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা যায় না। আদালত আইন মেনেই সঠিক পদক্ষেপ করেছে।
আপাতত শর্তসাপেক্ষ জামিনে কবি সাময়িক স্বস্তি পেলেও, এই আইনি লড়াই আগামীদিনে কোন মোড় নেয় এবং পরবর্তী শুনানিতে আদালত কী পর্যবেক্ষণ রাখে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে ওয়াকবহাল মহলের।
