ঋতব্রতর চাল ভেস্তে দিতে রাতারাতি নির্বাচন কমিশনে মমতা
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,কলকাতা: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর এবার আক্ষরিক অর্থেই আড়াআড়ি বিভক্ত ঘাসফুল শিবির। একদিকে নিউটাউনের পাঁচতারা হোটেল থেকে অরূপ রায়-ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের পাল্টা কমিটি গঠন, অন্যদিকে দলের রাশ নিজেদের হাতে রাখতে রাতারাতি নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবারের এই জোড়া ডেডলপ ঘিরে এখন সরগরম রাজ্য রাজনীতি। রাজনৈতিক মহলের মতে, ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেসের দাবিদার কে— তা নিয়ে এবার আইনি এবং সাংবিধানিক লড়াই শুরু হয়ে গেল কমিশনের চৌকাঠে, যার জল আগামীদিনে আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।
রাতারাতি মমতার পাল্টা চাল, কমিশনে জমা পড়ল তালিকা
সোমবার নিউটাউনের পাঁচতারা হোটেলে যখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পন্থীরা দল ও প্রতীক দখলের ব্লু-প্রিন্ট সাজাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কালীঘাট থেকে পাল্টা মাস্টারস্ট্রোক দেন তৃণমূল সুপ্রিমো। ঋতব্রত শিবিরের যাবতীয় পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে সোমবার রাতেই নির্বাচন কমিশনে দলের সংশোধিত জাতীয় কর্মসমিতি ও সাংগঠনিক কাঠামোর খুঁটিনাটি তথ্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কালীঘাটের পাঠানো ওই সংশোধিত তালিকায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে দলের রাশ কার হাতে। কমিশনে পাঠানো নথিতে পদাধিকারীরা হলেন:
-
চেয়ারপার্সন: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (নিজে স্বাক্ষর করেছেন)
-
সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক: অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
-
রাজ্য সভানেত্রী: চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য
-
যুগ্ম সম্পাদক: ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেন
-
কোষাধ্যক্ষ: শুভাশিস চক্রবর্তী
বড় রদবদল: রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, গত ৫ জুন কালীঘাটের বৈঠকে তৈরি হওয়া কমিটিতে অরূপ বিশ্বাস স্থান পেলেও, সোমবার রাতের এই সংশোধিত তালিকা থেকে তাঁকে বাদ দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিউটাউনের অধিবেশনে ব্রাত্য মমতা-অভিষেক, চেয়ারম্যান অরূপ রায়
এর আগে সোমবার দিনভর নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয় নিউটাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে। সেখানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলের একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়। বিধানসভায় ইতিমধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে ‘আসল’ বিরোধী দলের তকমা ছিনিয়ে নেওয়া ঋতব্রতপন্থীরা এদিন তাঁদের নিজস্ব ‘জাতীয় কর্মসমিতি’ ঘোষণা করেন।
চমকপ্রদভাবে, এই নতুন কমিটিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও জায়গাই হয়নি। ঋতব্রত শিবিরের ঘোষিত কমিটিতে:
-
চেয়ারপার্সন: অরূপ রায়
-
সাধারণ সম্পাদক: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (সহ আরও ৪ জন)
অধিবেশন শেষে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, নিয়ম মেনে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তাঁরা এই নতুন কমিটিকে নির্বাচন কমিশনে নথিভুক্ত করবেন। কিন্তু তাঁরা দিল্লিতে পা রাখার আগেই সোমবার রাতে ই-মেল ও বিশেষ বার্তাবাহক মারফত কমিশনের দুয়ারে পৌঁছে যায় কালীঘাটের নথি।
কোন দিকে মোড় নেবে ছাব্বিশের রাজনীতি?
নির্বাচনী ভরাডুবির পর থেকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সমান্তরাল শিবির চালাচ্ছিলেন ঋতব্রতপন্থীরা। কিন্তু সোমবারের ঘটনাপ্রবাহে এটা পরিষ্কার যে, এবার শুধু মুখে বা বিধানসভার অন্দরে নয়, জোড়াফুলের ‘নাম’ ও ‘প্রতীক’ কার— তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনে প্রতীক যুদ্ধের দামামা বেজে গেল।
একই দলের দাবিদার হিসেবে দুটি ভিন্ন জাতীয় কর্মসমিতির তালিকা এখন কমিশনের টেবিলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশন এখন দুই শিবিরের সাংগঠনিক শক্তি, বিধায়ক-সাংসদদের সংখ্যা এবং দলের সংবিধান খতিয়ে দেখবে। তবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পর এই লড়াই যে খুব দ্রুত সুপ্রিম কোর্টের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, সেই ইঙ্গিত এখনই মিলছে।
