আজকের দিনেগ্রীন রুম

প্রয়াত সুমন কল্যাণ: লতা-ছায়া পেরিয়ে নিজস্ব জাদুতে বুঁদ রাখা কণ্ঠ চিরতরে শান্ত

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, মুম্বই: ভারতীয় সঙ্গীত জগতের আকাশে লতা মঙ্গেশকর নামের সূর্য অস্ত গিয়েছে আগেই। এবার নিভল লতা-সমসাময়িক আরেক কিংবদন্তি গায়িকা সুমন কল্যাণপুরের  জীবনদীপও। গত কয়েক বছর ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভোগার পর, রবিবার রাত ৮টা নাগাদ মুম্বইয়ের লোখন্ডওয়ালার বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর。 জানা গেছে, জীবনের শেষ দিনগুলোয় আনমনে নিজের গাওয়া পুরনো গানগুলোই শুনতেন শিল্পী, আর সেই সুরের ঘোরেই চিরবিদায় নিলেন তিনি। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে মুম্বইয়ের পবন হংস শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা।

ঢাকা থেকে মুম্বই: ছবি আঁকার মেয়ে যেভাবে এলেন সুরে

১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ঢাকায় জন্ম সুমনের। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর আসল পদবি ছিল ‘হেমাডি’。 বাবা শঙ্কর রাও ব্যাঙ্কের চাকরিসূত্রে ঢাকায় থাকায় সুমনের শৈশব কেটেছে সেখানেই。 ১৯৪৩ সালে সপরিবারে তাঁরা মুম্বইয়ে চলে আসেন。

ছোটবেলায় সুমনের গায়িকা হওয়ার কোনো ইচ্ছেই ছিল না, বরং ছবি আঁকা আর সেলাইয়ের প্রতি প্রবল ঝোঁক থাকায় ভর্তি হয়েছিলেন বিখ্যাত ‘স্যার জেজে স্কুল অব আর্টস’-এ। কিন্তু একটি অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন প্রখ্যাত মারাঠি সঙ্গীত পরিচালক কেশবরাও ভোলে। তিনিই সুমনের বাবাকে বুঝিয়ে এই প্রতিভাকে এগিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। ১৯৫২ সালে আকাশবাণীতে প্রথম গান এবং ১৯৫৪ সালে ‘মঙ্গু’ ছবি দিয়ে হিন্দি প্লেব্যাকে পা রাখেন তিনি। ১৯৫৮ সালে ব্যবসায়ী রামানন্দ কল্যাণপুরের সঙ্গে বিয়ের পর তিনি হন ‘সুমন কল্যাণপুর’।

‘লতার মতো’ কণ্ঠই ছিল আশীর্বাদ ও অভিশাপ

‘আজকাল তেরে মেরে পেয়ার কে চর্চে’, ‘না না করতে পেয়ার তুমহি সে’ কিংবা ‘তুমনে পুকারা অওর হম চলে আয়ে’—এই কালজয়ী গানগুলো শুনলে আজও অনেকে লতা মঙ্গেশকরের গান বলে ভুল করেন। সুমনের গলার গঠন, টোন ও বিস্তার এতটাই লতাজির কাছাকাছি ছিল যে, সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা সঙ্গীত পরিচালকেরাও বিভ্রান্ত হতেন。

অনেকে একে তাঁর কেরিয়ারের অন্তরায় মনে করলেও সুমন কল্যাণপুর কখনো এই তুলনা গায়ে মাখেননি। তিনি লতাকে নকল করেননি, বরং অনুগামী ছিলেন এবং লতাজি ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের খুব ভালো বন্ধু। দুজনে একসঙ্গে ‘চাঁদ’ ছবির জন্য গানও রেকর্ড করেছিলেন।

রফি-র সঙ্গে জুড়ি ও বাংলা গানের মাইলফলক

ষাটের ও সত্তরের দশকে বলিউড প্লেব্যাকে নিজের মজবুত জমি তৈরি করেছিলেন সুমন। মোহাম্মদ রফির সঙ্গে তাঁর গাওয়া প্রায় ১৪০টি দ্বৈত গান (Duet) আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন। শচীনদেব বর্মন, শঙ্কর জয়কিষণ, মদনমোহন, রোশন, নৌশাদ ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো দিকপালদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

হিন্দি ছাড়াও মারাঠি, অসমীয়া, কন্নড় এবং বাংলায় অজস্র হিট গান উপহার দিয়েছেন তিনি। শিকড় কর্নাটকে হলেও বাঙালির আবেগ মিশে আছে সুমনের কণ্ঠে। তাঁর গাওয়া—

“মনে করো আমি নেই বসন্ত এসে গিয়েছে” এবং

“আমার স্বপ্ন দেখার দু’টি নয়ন”

গান দুটি বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরস্থায়ী মাইলফলক হয়ে থাকবে। সঙ্গীত রসিকদের মতে, সুমনের কণ্ঠে এমন এক অমলিন ব্যথা ছিল যা সরাসরি হৃদয় ছুঁয়ে যেত।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা

সঙ্গীত জগতে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে ‘লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার’-এ ভূষিত করে। এরপর ২০২৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’-এ সম্মানিত করে।

আমেরিকায় প্রবাসী একমাত্র কন্যা চারুলা এবং মেলোডি সাম্রাজ্যের কোটি কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে সুরের রানি চলে গেলেন ওপারে। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীত জগতে যে গভীর শূন্যতা তৈরি হলো, তা অপূরণীয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *