১৫ জোনে বিভক্ত দিল্লি! চলছে ‘O-Zone’-এ বুলডোজার ঝড়!
নয়াদিল্লি: সাম্প্রতিক সময়ে যমুনা নদীর প্লাবনভূমি বা পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে (Zone O) প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে যখন শোরগোল তুঙ্গে । দিল্লির ‘O-Zone’ বা যমুনা নদীর প্লাবনভূমি অঞ্চলে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বড়সড় পদক্ষেপ শুরু করেছে প্রশাসন। দিল্লি হাইকোর্টের কঠোর অবস্থানের পর, দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে মজনু কা টিলা, ওয়াজিরাবাদ, জগতপুর এবং মনেস্ট্রি মার্কেটের মতো এলাকাগুলোতে ব্যাপক বুলডোজার অভিযান চালিয়েছে।
এই উচ্ছেদ অভিযানের পর দিল্লির সাধারণ মানুষের মনে কৌতুহল তৈরি হয়েছে যে, দিল্লির মাস্টার প্ল্যান ও পরিকল্পিত উন্নয়নের স্বার্থে রাজধানীকে ঠিক কতগুলো জোনে ভাগ করা হয়েছে এবং কোন কোন এলাকা কোন জোনের অধীনে পড়ে।
দিল্লির ১৫টি প্ল্যানিং জোন: এক নজরে DDA-এর মাস্টার প্ল্যান
ডিপার্টমেন্ট অফ দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (DDA)-এর মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, দিল্লির পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য পুরো রাজধানীকে মোট ১৫টি প্ল্যানিং জোনে ভাগ করা হয়েছে। এই জোনগুলোকে ইংরেজি বর্ণমালার A থেকে P (শুধুমাত্র ‘I’ বাদ দিয়ে) অক্ষর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে দিল্লির কোন এলাকা কোন জোনে পড়ছে, তার একটি সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হলো।
এক নজরে DDA-এর দিল্লির মাস্টার প্ল্যান: ১৫টি জোন ও তাদের প্রধান এলাকাসমূহ
-
Zone A (পুরনো দিল্লি ও প্রাচীর ঘেরা শহর): এই জোনের মধ্যে পড়ছে দিল্লির ঐতিহ্যবাহী ও ব্যস্ততম এলাকাগুলো। যেমন— চাঁদনি চক, জামা মসজিদ, কাশ্মীরি গেট, পাহাড়গঞ্জ এবং সদর বাজার।
-
Zone B (পুরনো দিল্লির সম্প্রসারিত অংশ): পুরনো দিল্লির লাগোয়া অঞ্চল হিসেবে করোল বাগ, প্যাটেল নগর, আনন্দ পর্বত এবং সরাই রোহিল্লা রয়েছে এই জোনে।
-
Zone C (উত্তর দিল্লি): দিল্লির এই গুরুত্বপূর্ণ জোনে রয়েছে আজাদপুর, সিভিল লাইনস, কমলা নগর, দিল্লি ইউনিভার্সিটি নর্থ ক্যাম্পাস, মডেল টাউন এবং অশোক বিহার।
-
Zone D (ভিভিআইপি ও দিল্লির কেন্দ্রস্থল): দেশের ক্ষমতার অলিন্দ হিসেবে পরিচিত পুরো লুটিয়েন্স দিল্লি, কনট প্লেস, চাণক্যপুরী, খান মার্কেট এবং লোদি রোডকে এই জোনে রাখা হয়েছে।
-
Zone E (যমুনা পার বা পূর্ব দিল্লি): অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত শাহদারা, ময়ূর বিহার, লক্ষ্মী নগর, প্রীত বিহার এবং আনন্দ বিহার রয়েছে এই জোনে।
-
Zone F (দক্ষিণ দিল্লি): দিল্লির পশ ও উন্নত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম সাকেত, বসন্ত কুঞ্জ, গ্রেটার কৈলাশ, গ্রিন পার্ক, হৌজ খাস এবং নেহেরু প্লেস এই জোনের অন্তর্ভুক্ত।
-
Zone G (পশ্চিম দিল্লি): বড় বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা রাজৌরি গার্ডেন, পাঞ্জাবি বাগ, জনকপুরী, বিকাশপুরী এবং উত্তম নগর রয়েছে এখানে।
-
Zone H (উত্তর-পশ্চিম দিল্লি): পরিকল্পিত আবাসন এলাকা রোহিণীর ফেজ ১ ও ২, প্রীতমপুরা, শালিমার বাগ এবং সরস্বতী বিহার এই জোনের অংশ।
শহরতলি ও গ্রামীণ জোনসমূহ
-
Zone J (দক্ষিণ দিল্লির গ্রামীণ ও শহরতলি): মেহরাউলি, ছতরপুর, সৈনিক ফার্মস এবং ঘিটোরনির মতো আধা-শহুরে এলাকা রয়েছে এই জোনে।
-
Zone K (দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লি): দিল্লির আধুনিক উপনগরী বা দ্বারকা সাব-সিটি, নজফগড়, পালাম এবং ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা এই জোনের অন্তর্গত।
-
Zone L (দূরবর্তী পশ্চিম প্রান্তের গ্রামীণ সীমান্ত): হরিয়ানার সীমানা সংলগ্ন টিকরি কালান্দ এবং নজফগড়ের গ্রামীণ অংশকে এই জোনে রাখা হয়েছে।
-
Zone M (রোহিণীর সম্প্রসারিত অংশ): রোহিণী ফেজ ৩, ৪, ৫ ছাড়াও মঙ্গোলপুরী এবং সুলতানপুরী রয়েছে এই জোনের মধ্যে।
-
Zone N (হরিয়ানা সীমান্ত সংলগ্ন বাইরের গ্রামীণ এলাকা): বাওয়ানা, কঞ্ঝাওলা এবং আলিপুরের মতো বাইরের দিকের গ্রামীণ অঞ্চলগুলো এই জোনে পড়ে।
পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ও নজরদারি জোন
Zone O (যমুনা নদীর প্লাবনভূমি বা ডুব অঞ্চল): দিল্লির এই জোনটি বর্তমানে খবরের শিরোনামে। মজনু কা টিলা, জগতপুর, ওয়াজিরাবাদ এবং মদনপুর খাদরের কচ্ছ অঞ্চলের মতো পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এই জোনে পড়ে, যেখানে পরিবেশ রক্ষার্থে বর্তমানে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে বুলডোজার অভিযান চালানো হচ্ছে।
-
Zone P (উত্তর দিল্লির শেষ প্রান্ত): মূলত নরেলা সাব-সিটি, আলিপুর এবং বুরারির মতো উত্তর দিল্লির শেষ প্রান্তের এলাকাগুলো এই জোনে পড়ে। এই জোনটিকে মূলত P-I এবং P-II— এই দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত: ডিডিএ-এর আধিকারিকদের মতে, এই জোনিং ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি এলাকার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব বুঝে সেখানকার জলনিকাশি, রাস্তাঘাট ও নাগরিক পরিষেবা আরও উন্নত করা। ‘Zone O’-এর মতো স্পর্শকাতর এলাকায় কোনো স্থায়ী আবাসন যাতে গড়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন এখন বাড়তি কড়া নজর রাখছে।
কেন এই জোনিং ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ?
ডিডিএ (DDA) এই জোনগুলোর ওপর ভিত্তি করেই দিল্লির আবাসন, বাণিজ্যিক এলাকা, সবুজায়ন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করে। ‘Zone O’-এর মতো সংবেদনশীল পরিবেশগত অঞ্চলে যেকোনো ধরণের স্থায়ী নির্মাণ আইনত নিষিদ্ধ, আর সেই কারণেই আদালতের নির্দেশে এই জোনে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
