আজকের দিনেতিলোত্তমা

আবাস, রেশন ও জল প্রকল্পে মেগা ক্র্যাকডাউন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,কলকাতা: ক্ষমতা দখলের পরই ‘জিরো টলারেন্স’ বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছিলেন। এবার সরকার গঠনের দ্বিতীয় সপ্তাহেই বড়সড় ‘অ্যাকশনে’ নেমে পড়লেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য প্রশাসনকে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং বিগত জমানার একের পর এক কেলেঙ্কারির শিকড় উপড়ে ফেলতে এবার সরাসরি পুলিশকে ময়দানে নামার নির্দেশ দিলেন তিনি।

নবান্ন সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চায়েত, খাদ্য এবং জনস্বাস্থ্য কারিগরি  দফতরের একগুচ্ছ বড় অনিয়মের তদন্তে শুধু ঠিকাদার বা ভুয়ো সুবিধাভোগী নয়— যে সব সরকারি আধিকারিক এই দুর্নীতির ফাইলে সই করেছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

১. পঞ্চায়েত দফতর: ‘আবাস’ যোজনার ভুয়ো প্রাপক ও অফিসারদের বিরুদ্ধে FIR

অতীতে গ্রামীণ স্তরে ‘বাংলার আবাস যোজনা’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। নবান্নের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকৃত যোগ্য বহু মানুষ ঘর পাননি, অথচ প্রভাবশালীদের মদতে বহু অযোগ্য ব্যক্তি এই প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে পাকা বাড়ি তৈরি করে ফেলেছেন।

  • নির্দেশ: যারা অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বেআইনিভাবে আবাস যোজনার বাড়ি হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

  • অফিসারদের কোপ: সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই অযোগ্যদের তালিকায় যে সমস্ত সরকারি আধিকারিক ও পঞ্চায়েত স্তরের অফিসাররা নিয়ম ভেঙে অনুমোদন দিয়েছিলেন, স্ক্রুটিনি না করেই ছাড়পত্র দিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও সরাসরি এফআইআর দায়ের করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২. খাদ্য দফতর: রেশন চুরির ‘ঘুণ’ পরিষ্কারের কড়া নিদান

রাজ্যে রেশন কেলেঙ্কারি নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর এবার খাদ্য দফতরের ভেতরে থাকা ‘ঘুণ’ পরিষ্কার করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তদন্তে দেখা গেছে, মৃত ব্যক্তি বা অস্তিত্বহীন ভুয়ো কার্ডের নামে মাসের পর মাস ডিজিটাল রেশন সামগ্রী তুলে তা খোলা বাজারে পাচার করা হয়েছে।

  • নির্দেশ: যাদের নামে বা যাদের মদতে এই ভুয়ো রেশন তোলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই চুরির চক্রে খাদ্য দফতরের যে সমস্ত ইন্সপেক্টর বা উচ্চপদস্থ অফিসার যুক্ত ছিলেন, ফাইল চোখ বন্ধ করে পাস করিয়েছিলেন, তাঁদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না। সেই সমস্ত যুক্ত অফিসারদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধেও অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

৩. জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর: ‘জল জীবন মিশন’-এ নিম্নমানের কাজের পর্দাফাঁস

জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের অধীনস্থ কেন্দ্রীয় প্রকল্প ‘জল জীবন মিশন’-এর মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার কাজে বাংলায় বিরাট অঙ্কের আর্থিক তছরুপের অভিযোগ সামনে এসেছে। একাধিক এলাকায় পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মাটির নিচে অত্যন্ত নিম্নমানের পাইপ বিছানো হয়েছে, যা অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

  • নির্দেশ: এই চক্রের পাণ্ডা যে পাইপ সরবরাহকারী সংস্থা ও ঠিকাদার, তাদের বিরুদ্ধে তো বটেই, একই সঙ্গে পিএইচই (PHE) দফতরের যে ইঞ্জিনিয়ার ও আধিকারিকরা সাইট ভিজিট না করেই ওই নিম্নমানের কাজের বিল পাস করিয়ে সরকারি টাকা পাইয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফাইলের পেছনে কার হাত, দেখার দরকার নেই: নবান্নে আতঙ্ক

মুখ্যমন্ত্রীর এই নজিরবিহীন নির্দেশের পর নবান্নের অলিন্দে এখন চরম কম্পন শুরু হয়েছে। কারণ, সাধারণত কোনো দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত বা বড়জোর সাসপেনশনের পথে হাঁটে সরকার। কিন্তু শুরুতেই খোদ আমলা ও অফিসারদের নাম এফআইআর-এ জড়ানোর এই নির্দেশ একপ্রকার নজিরবিহীন।

মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ফাইলের পেছনে কার হাত রয়েছে বা কার কী রাজনৈতিক পরিচয়, তা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। সরকারি অর্থের অপচয় ও সাধারণ মানুষের হক যারা কেড়েছে, তাদের জায়গা হবে সোজা হাজতে। এই মেগা ক্র্যাকডাউনের জেরে বহু দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসারের রাতের ঘুম উড়তে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *