ভাইবোনেদের কাঁধে প্রাক্তনীদের হাত
ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দ্রুত বদলাচ্ছিল কলকাতা। নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে দরকার হচ্ছিল দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, আর সেই প্রয়োজন থেকেই ১৮৫৬ সালের ২৪ নভেম্বর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে শুরু হয়েছিল কলকাতা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। অল্প কয়েকজন ছাত্র ও শিক্ষকের হাত ধরে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ ঘুরে ১৮৮০ সালে স্থায়ী ঠিকানা পায় হাওড়ার শিবপুরে। সময়ের সঙ্গে নাম বদলেছে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পরে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, আর আজকের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, শিবপুর। নাম পাল্টালেও ঐতিহ্য ও গর্ব একই রয়ে গেছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে পড়াশোনার খরচও। একসময় যেখানে সামান্য টাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া যেত, এখন সেখানে কয়েক লক্ষ টাকা লাগে। ফলে বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী শুধুমাত্র অর্থের অভাবে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় থাকে। এই বাস্তবতা নাড়িয়ে দিয়েছিল বিদেশে থাকা কয়েকজন প্রাক্তনীকে। ১৯৯৭-৯৮ সালে সানফ্রান্সিসকোয় থাকা চারজন প্রাক্তনী সিদ্ধান্ত নেন ছোট ভাইবোনদের পাশে দাঁড়াতেই হবে। শুরু হয় এলুমনি স্কলারশিপ। প্রথমে কয়েকজন ছাত্রকে আট হাজার টাকা করে সাহায্য করার সেই ছোট উদ্যোগ ধীরে ধীরে বড় হতে হতে আজ এক বিশাল পরিবারের রূপ নিয়েছে।

একসময় এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার খরচ ছিল খুবই কম। গ্রামের সাধারণ পরিবারের মেধাবী ছাত্ররাও সহজেই আসতে পারতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এই খবর। প্রাক্তনীদের কথায়, আশির দশকেও বছরে অল্প টাকাতেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া যেত, হোস্টেলের খরচও ছিল যৎসামান্য। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে পড়ার খরচ কয়েক লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রীর কাছে সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় পড়াশোনার খরচ জোগাড় করা। শুধু পড়া নয়, টিকে থাকার লড়াইও চালাতে হয় তাঁদের। এই বাস্তব পরিস্থিতি অনুভব করেছিলেন বিদেশে থাকা কয়েকজন প্রাক্তনী। ১৯৯৭-৯৮ সালে সানফ্রান্সিসকোয় থাকা চারজন প্রাক্তনী ভেবেছিলেন “একসময় আমরাও এই ক্যাম্পাসে সুযোগ পেয়েছিলাম, এখন আমাদের দায়িত্ব ছোট ভাইবোনদের পাশে দাঁড়ানোর”। সেই ভাবনা থেকেই শুরু এলুমনি স্কলারশিপ। প্রথমে ১৯৯৯ সালে কয়েকজন অর্থকষ্টে থাকা কয়েকজন
ছাত্রকে আট হাজার টাকা করে সাহায্য করা হয়েছিল। ছোট সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে বড় হতে হতে আজ এক বিশাল সহায়তা প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।
১৯৯৯ সাল থেকে ২০২৬ প্রায় পঁচিশ বছরেরও বেশি সময়ে ২৫০০-এর বেশি ছাত্রছাত্রী এই সহায়তা পেয়েছে। মোট আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ ছাড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ১২০ থেকে ১৩৬ জন পড়ুয়া স্কলারশিপ পায় এবং প্রত্যেকে প্রায় ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পায়। শুধু গত বছরেই প্রায় ৩২ লক্ষ টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে, আর চলতি বছরে মোট সহায়তা প্রায় ৩৪ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকা। যাদের হাতে এই সাহায্য পৌঁছয় তাঁরা সকলেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের সন্তান অর্থাৎ সামান্য সহায়তাই তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস দেয়।
২০০৫ সালে প্রাক্তনীদের সংগঠন ” গাবেসু” গড়ে ওঠার পর উদ্যোগ আরও সংগঠিত রূপ পায়। শুধু আর্থিক সাহায্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ২০০৮ সালে চালু হয় এ্যালুমনি ফেলোশিপ ফর এক্সেলেন্স যেখানে ভালো রেজাল্টের পাশাপাশি খেলাধুলা, সংগীত বা নেতৃত্বের গুণ থাকলেও সম্মান দেওয়া হয়। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের পূর্ণ বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১২ সালে শুরু হয় রিসার্চ ফেলোশিপ এওয়ার্ড, যাতে গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং নতুন ভাবনা সামনে আসে।
আজ এই উদ্যোগ শুধু একটি শহর বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউকে, কানাডা-সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তনীরা এতে যুক্ত হয়েছেন। দূরে থাকলেও তাঁদের কাছে শিবপুর শুধুই পুরনো কলেজ নয় এটি নিজের বাড়ি। তাই তাঁরা চান, অর্থের অভাবে কোনও মেধা যেন মাঝপথে থেমে না যায়।
সাম্প্রতিক স্কলারশিপ প্রদান অনুষ্ঠান তাই কেবল পুরস্কার বিতরণ ছিল না, ছিল এক আবেগঘন মুহূর্ত। একসময় যে ছাত্র এই ক্যাম্পাসে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই আরেক ছাত্রের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখছে। যেন এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মের হাতে আলো তুলে দিচ্ছে। প্রাক্তনীদের একটাই আশা আজ যারা সাহায্য পেল, কাল তাঁরা বড় হয়ে অন্য কারও পাশে দাঁড়াবে।
এই উদ্যোগের আসল শক্তি টাকার অঙ্কে নয়, সম্পর্কের বন্ধনে। এখানে দান নয়, আছে দায়িত্ববোধ; সহায়তা নয়, আছে নিজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতি। তাই এই গল্প কেবল একটি স্কলারশিপ প্রকল্পের নয় এটি ভালোবাসা, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ গড়ার এক চলমান যাত্রা।
