আজকের দিনেযেদিকে দু-চোখ যায়

রথের রশি স্পর্শেই কি মোক্ষলাভ?

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, নিউজ ডেস্ক: হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হলো ওড়িশার সমুদ্র তীরবর্তী শহর পুরীধাম। বদ্রীনাথ, দ্বারকা এবং রামেশ্বরমের পাশাপাশি পুরীর জগন্নাথ মন্দির বিষ্ণুর সনাতন চারধামের একটি। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বারকার শ্রীকৃষ্ণই পুরীতে জগন্নাথদেব রূপে আসীন। আর এই পুরীধামের তথা সমগ্র ওডিশার প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো রথযাত্রা।

প্রতি বছর আষাঢ় মাসে তিনটি সুসজ্জিত পৃথক রথে চড়ে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। ওডিশার উৎসব হলেও রথযাত্রাকে ঘিরে বাঙালিদের মধ্যেও উন্মাদনার শেষ নেই। শ্রীরামপুরের মাহেশ, কলকাতার ইসকন থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ে শিশুদের ছোট কাঠের রথ—এই দিনে মেতে ওঠে গোটা বাংলা।

আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ও পৌরাণিক গাথা

রথযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে এক মধুর লীলা। আষাঢ় মাসে জগন্নাথদেব তাঁর অগ্রজ বলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে গুন্ডিচা মন্দিরে (মাসির বাড়ি) যান। এই যাত্রার বিশেষত্ব হলো, বছরের এই সময়ে ভগবান স্বয়ং ভক্তদের মাঝে নেমে আসেন। যারা মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে পারেন না, তারাও যাতে মহাপ্রভুর দর্শন পেয়ে ধন্য হতে পারেন, সেই কারণেই এই আয়োজন।

রথের রশি টানা যেন নিজেকে ভগবানের রথের সারথি হিসেবে সমর্পণ করা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ যেমন অর্জুনের সারথি হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি রথ টেনে ভক্তরা অনুভব করেন যে তারা সরাসরি ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হচ্ছেন।

তিন ভাই-বোনের তিন ভিন্ন রথ

মহোৎসবের এই দিনটিতে তিন ভাই-বোনের জন্য তৈরি হয় তিনটি বিশেষ রথ:

  • জগন্নাথদেবের রথ: নান্দীঘোষ

  • বলভদ্রের রথ: তালধ্বজ

  • দেবী সুভদ্রার রথ: দেবদলন (বা পদ্মধ্বজ)

কেন রথের দড়ি টানতে ব্যাকুল হন লাখো ভক্ত?

রথযাত্রার মূল আকর্ষণ হলো এর রশি টানা। ভক্তদের বিশ্বাস, এই রশি স্পর্শ করার পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও পৌরাণিক মাহাত্ম্য:

  • ‘শঙ্খচূড়’ নাগের প্রতীক: ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথের দড়িটি আসলে পৌরাণিক নাগ ‘শঙ্খচূড়’-এর প্রতীক। এটি স্পর্শ করলে জীবনের সমস্ত জ্ঞাত ও অজ্ঞাত পাপ ধুয়ে যায়।

  • মোক্ষ ও বৈকুণ্ঠ লাভ: মনে করা হয়, রথের চাকা ঘোরার সাথে মানুষের ভাগ্যচক্রও আবর্তিত হয়। যিনি এই রশি টানার সুযোগ পান, তিনি সরাসরি মোক্ষ লাভ করেন এবং জন্ম-মৃত্যুর জাগতিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়ে বৈকুণ্ঠ ধামে স্থান পান।

  • অহংকার বিনাশ ও সারথির অনুভূতি: রথের দড়ি ধরা মানে ঈশ্বরের সামনে নিজের অহংকার বিসর্জন দেওয়া। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ যেমন অর্জুনের সারথি হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি রথ টেনে ভক্তরা ভগবানের সারথি হওয়ার একাত্ম অনুভূতি লাভ করেন।

  • সাম্যের অনন্য বার্তা: এই উৎসব জাতিভেদ ও ধনী-দরিদ্রের প্রাচীর ভেঙে দেয়। এখানে রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই একই রশি ধরে নিজেদের আরাধ্য দেবতাকে টেনে নিয়ে যান, যা পরম সম্প্রীতির এক অনুপম উদাহরণ।

লাখো মানুষের ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনির এই মহাসমুদ্র আমাদের শিক্ষা দেয়—জীবনরূপী রথের রাশ যদি ঈশ্বরের হাতে সমর্পণ করা যায়, তবে সংসারের সমস্ত কঠিন পথই মসৃণ হয়ে যায়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *