মমতার পার্টি অফিস ফাঁকা করার নোটিশ দিলেন একদা ছায়াসঙ্গী ‘মণ্টুদা’
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,কলকাতা: রাজনীতি বরাবরই নিষ্ঠুর। ক্ষমতার সুদিনে যাঁরা ছায়ার মতো পাশে থাকেন, দুর্দিন আসতেই তাঁরা হাত তুলে নিতে দ্বিধা করেন না। তৃণমূলের ক্ষমতাচ্যুতির পর এবার সেই চরম বাস্তবতার মুখোমুখি কালীঘাট। রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে মাইক ও চেয়ার না পাঠিয়ে আগেই দূরত্ব বাড়িয়েছিলেন ‘মডার্ন ডেকরেটিং’-এর মালিক মনোতোষ সাহা ওরফে মণ্টু সাহা। এবার তৃণমূলের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে আরও বড় ধাক্কা দিলেন মমতার একদা এই অত্যন্ত আস্থাভাজন ‘মণ্টুদা’। স্রেফ মেগা ইভেন্টে মাইক-সাউন্ড পাঠানো বন্ধ করাই নয়, এবার ইএম বাইপাসের ধারে তৃণমূলের যে অস্থায়ী সদর কার্যালয় বা পার্টি অফিসটি রয়েছে, তা আগামী ২ মাসের মধ্যে খালি করে দেওয়ার জন্য সরাসরি চিঠি ধরিয়ে দিলেন তিনি!
তপসিয়া থেকে মেট্রোপলিটন: মণ্টুর বাড়িতেই চলত ‘তৃণমূল ভবন’
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তপসিয়ার পুরনো ‘তৃণমূল ভবন’টি ভেঙে সম্পূর্ণ কর্পোরেট কায়দায় নতুন করে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় দলের মূল কার্যালয়টি সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বাইপাস ধাবার পেছনে মেট্রোপলিটন এলাকায় একটি বহুতলকে বেছে নেওয়া হয়। আর সেই বাড়িটির মালিক ছিলেন আর কেউ নন—দিদির প্রিয়পাত্র মণ্টু সাহা। দক্ষিণ কলকাতায় ছোট একটি ডেকরেটিংয়ের ব্যবসা থেকে শুরু করে আজ তাঁর বটগাছ হয়ে ওঠার নেপথ্যে তৃণমূল জমানার অবদান ছিল প্রশ্নাতীত। দলীয় সূত্রের খবর, সেই মণ্টু সাহাই কদিন আগে তৃণমূল নেতৃত্বকে চিঠি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ২ মাসের মধ্যে ওই বহুতলটি সম্পূর্ণ খালি করে দিতে হবে।
‘বিনামূল্যে’ বহুতল ব্যবহারের নেপথ্যে কী ছিল? প্রশ্ন বিরোধীদের
এতদিন এই বিলাসবহুল বাড়িটির ভাড়া বাবদ তৃণমূলের থেকে মণ্টু সাহা কোনো টাকা নিতেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে বিরোধীদের অভিযোগ—গত জমানায় ‘উত্তীর্ণ’ সভাঘর বা ইকো পার্কের ‘মিষ্টিকা ব্যাঙ্কোয়েট’-এর মতো কয়েকশো কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি লিজ ও ঢালাও কাজের বরাত পাওয়ার বিনিময়েই এই বহুতলটি তৃণমূলকে সম্পূর্ণ ‘বিনামূল্যে’ ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন মণ্টু সাহা। এখন রাজ্যে ক্ষমতা বদল হতেই তড়িঘড়ি দূরত্ব বাড়াতে চাইছেন তিনি।
‘কেঁচো খুঁড়তে কেচাপ’ বেরোনোর আতঙ্ক?
পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, তৃণমূলের প্রাক্তন ঘনিষ্ঠদের রাতারাতি এই দূরত্ব বাড়ানোর নেপথ্যে কাজ করছে এক চরম আতঙ্ক। রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতা দখলের পর থেকেই যেভাবে পুরনো দুর্নীতির ফাইল খোলা শুরু করেছে এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যেভাবে একের পর এক এফআইআর -এর নির্দেশ দিচ্ছেন, তাতে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা—কেঁচো খুঁড়তে গেলে হয়তো এবার স্বজনপোষণের বড় বড় কেলেঙ্কারি সামনে চলে আসতে পারে।
গত ১৫ বছর ধরে তৃণমূলের সমস্ত মেগা ইভেন্টের নেপথ্যে মণ্টু সাহার আধিপত্য ছিল একচ্ছত্র। দিদির বাড়ির কালীপুজোর প্যান্ডেল থেকে শুরু করে ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চ বাঁধা—সবই তিনিই করতেন। অথচ ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলাতেই সুর বদলে মণ্টু সাহার বিস্ফোরক দাবি, “টাকাই দিত না, একটা কাজের অর্ডার দিলে দুটো কাজ ফ্রিতে করিয়ে নিত, ৪০ লাখের ইফতার পার্টির পুরো টাকা মেলেনি।”
তৃণমূলের পাল্টা দাবি: অন্যদিকে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ঢাকতে তৃণমূলের একটি সূত্রের দাবি, মণ্টু সাহাকে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে যে তপসিয়ায় দলের মূল পার্টি অফিস নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। বাড়িটি ব্যবহারের উপযুক্ত হয়ে গেলেই মেট্রোপলিটনের এই অস্থায়ী আস্তানা ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, কারণ যাই হোক না কেন, সুদিনের বন্ধুদের এই ভোলবদল কালীঘাটের জন্য বড় ধাক্কা।
