মৎস্যক্রীড়াসনে মিলবে স্বস্তি, ব্যস্ত জীবনে ক্লান্ত শরীর–মনের সহজ সমাধান …..
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা:- রোজের ব্যস্ত জীবনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দৌড়ে চলাই যেন নিয়ম। সকালবেলা তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে অফিসের উদ্দেশে বেরোনো, ভিড় বাস-ট্রেনের ধকল সামলে কর্মক্ষেত্রে সারাদিনের মানসিক চাপ, সময়সীমার তাড়া, নানা দায়িত্ব—সব মিলিয়ে শরীর ও মন দুই-ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বাড়ি ফিরেও বিশ্রামের সুযোগ খুব কম। সংসারের কাজ, পরিবারের দায়িত্ব, পরের দিনের প্রস্তুতি সবকিছু সামলে যখন নিজের জন্য একটু সময় পাওয়া যায়, তখন শরীর যেন আর সায় দিতে চায় না। ধীরে ধীরে এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের প্রভাব পড়তে শুরু করে শরীরে। গ্যাস-অম্বল, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, পায়ের ব্যথা, ঘাড়-কাঁধে টান, অনিদ্রা কিংবা অকারণ উদ্বেগ এগুলি অনেক সময়েই নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়। কিন্তু নিয়ম মেনে শরীরচর্চা করার ইচ্ছা বা শক্তি অনেকেরই থাকে না। জিমে যাওয়া বা কঠিন ব্যায়াম করার মতো মানসিক প্রস্তুতিও তৈরি হয় না। এমন পরিস্থিতিতে সহজ, শান্ত এবং শিথিল এক যোগাভ্যাস হতে পারে অত্যন্ত কার্যকর সমাধান মৎস্যক্রীড়াসন, যা অনেক যোগ প্রশিক্ষক ‘ফ্ল্যাপিং ফিশ পোজ়’ নামেও পরিচিত।
মৎস্যক্রীড়াসন এমন একটি বিশ্রামমূলক আসন, যা মূলত শরীরকে গভীরভাবে শিথিল করতে সাহায্য করে। এই আসন করতে বিশেষ কসরতের প্রয়োজন নেই, লাফঝাঁপ বা জোর প্রয়োগেরও দরকার হয় না। উপুড় হয়ে শুয়ে থেকেই ধীরে, নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে এই আসন করা যায়। প্রথমে একটি সমতল স্থানে যোগম্যাট বিছিয়ে উপুড় হয়ে শুতে হবে। পুরো শরীর ঢিলে করে দিতে হবে, যেন কোনও অপ্রয়োজনীয় টান না থাকে। এরপর দুই হাতের কনুই ভাঁজ করে হাতের পাতা মাথার নীচে রাখতে হবে। মাথা এমনভাবে রাখা উচিত যাতে ঘাড়ে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এবং আরামদায়ক অনুভূতি বজায় থাকে। তারপর বাঁ পা হাঁটু থেকে ভাঁজ করে ধীরে ধীরে বুকের দিকে টেনে আনতে হবে, ডান পা সোজা থাকবে। বাঁ হাতের কনুই ও বাঁ হাঁটু যতটা সম্ভব কাছাকাছি আনার চেষ্টা করতে হবে, তবে জোর করে নয় স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখে। চোখ বন্ধ করে স্বাভাবিক, গভীর শ্বাস নিতে নিতে এই অবস্থায় কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকতে হবে। শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ যেন ধীর ও দীর্ঘ হয়, তাতে মনও শান্ত হতে শুরু করবে। কিছুক্ষণ পর পা সোজা করে বিশ্রাম নিয়ে একই পদ্ধতিতে ডান দিকেও আসনটি করতে হবে। প্রয়োজনে মাথা বা হাঁটুর নীচে ছোট বালিশ ব্যবহার করা যেতে পারে, বিশেষ করে যাঁদের কোমর বা ঘাড়ে হালকা অস্বস্তি রয়েছে।
এই আসনের উপকারিতা বহুস্তরীয়। পেটের উপর হালকা চাপ সৃষ্টি হওয়ায় হজমশক্তি উন্নত হয় এবং গ্যাস-অম্বলের সমস্যা কমতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও এটি সহায়ক হতে পারে, কারণ অন্ত্রের স্বাভাবিক গতি উদ্দীপিত হয়। পাশাপাশি পায়ের স্নায়ু ও পেশিতে রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, ফলে পায়ের ক্লান্তি ও টান কমে যায়। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার ফলে শরীরে যে অবসন্নতা জমে ওঠে, তা দূর করতে এই আসন অত্যন্ত কার্যকর। মানসিক দিক থেকেও এর উপকার স্পষ্ট গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কমে আসে। নিয়মিত অভ্যাস করলে অনিদ্রার সমস্যাও কমতে পারে এবং ঘুমের গুণমান উন্নত হয়। সারাদিনের চাপের পর এই আসন যেন শরীর ও মনের জন্য একটি ছোট্ট বিরতির মতো কাজ করে।
তবে সকলের ক্ষেত্রে এই আসন সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। যাঁদের হাঁটুতে সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাঁদের এই আসন না করাই ভালো। আবার ঘাড় বা কাঁধে গুরুতর আঘাত, অস্ত্রোপচার বা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই আসন করা উচিত নয়। শরীরের সীমাবদ্ধতাকে সম্মান জানিয়ে, স্বাচ্ছন্দ্যের সীমার মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্যস্ত জীবনে সুস্থ থাকার জন্য সবসময় কঠিন ব্যায়াম বা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও কয়েক মিনিটের সচেতন বিশ্রামই শরীর ও মনকে নতুন শক্তি দেয়। মৎস্যক্রীড়াসন সেই সহজ পথগুলির একটি যেখানে থামার মধ্যেই রয়েছে এগিয়ে চলার শক্তি।
