খামেনেইয়ের মৃত্যুর দাবি ঘিরে তোলপাড় বিশ্বরাজনীতি, ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-এর মৃত্যুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, বিশ্বের ‘সবচেয়ে কুখ্যাত ব্যক্তি’ খামেনেই নিহত হয়েছেন এবং এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-র তরফেও কূটনৈতিক বার্তা সামনে এসেছে। তবে এই ঘটনার নেপথ্যে কীভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা নিয়েই এখন জোর জল্পনা।
সূত্রের খবর, কয়েক মাস ধরেই ইজরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) যৌথভাবে খামেনেইকে টার্গেট করে নজরদারি চালাচ্ছিল। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল, দফতরের নিরাপত্তা বলয়—সব কিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। এমনকি কার্যালয়ের আশপাশের কিছু সিসিটিভি ক্যামেরা হ্যাক করার অভিযোগও উঠেছে।
এর পাশাপাশি সামনে এসেছে অন্তর্ঘাতের তত্ত্ব। জানা গিয়েছে, শনিবার সকালে নিজের কার্যালয়ে উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে একটি গোপন বৈঠক করছিলেন খামেনেই। অভিযোগ, ইরানের অন্দরমহল থেকেই কেউ সেই বৈঠকের নির্দিষ্ট তথ্য মোসাদের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে কোথায় এবং কখন বৈঠক চলছে, সেই সুনির্দিষ্ট তথ্য হাতে পেয়েই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। তেহরানে তাঁর কার্যালয় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে খামেনেইয়ের ঘনিষ্ঠ চার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের নামও। তাঁরা হলেন খামেনেইয়ের নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলি শামখানি,
ইরানের সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ জেনারেল আবদেলরাহিম মুসাভি,আইআরজিসির কমান্ডার ইন চিফ মহম্মদ পাকপুর,এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদে। প্রশ্ন উঠছে, এই উচ্চপর্যায়ের বলয়ের মধ্যেই কি কোথাও ফাঁক ছিল? বিশ্বাসঘাতকতার জাল কি এতটাই গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল যে সুপ্রিম লিডারের অবস্থান গোপন রাখা সম্ভব হয়নি?
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত বছরের শেষ থেকে ইরানে মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জোরদার হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ পথে নেমে খামেনেইয়ের পদত্যাগ দাবি করেন। সেই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন ট্রাম্পও। এই প্রেক্ষাপটে খামেনেইয়ের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির অবসান নয়, বরং ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তার সূচনা।
সব মিলিয়ে, আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-এর মৃত্যুর খবর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। চার দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই নেতার অনুপস্থিতিতে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। ক্ষমতার উত্তরাধিকার, সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের অবস্থান, এবং জনতার দীর্ঘদিনের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল ইরানের শাসনব্যবস্থা কোন পথে হাঁটবে। কড়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বর্তমান কাঠামো অটুট রাখার চেষ্টা হবে, নাকি জনমতের চাপে সংস্কারের রাস্তা খুলবে? একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে—আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক, পরমাণু চুক্তি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা, এবং গোটা পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারিত হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের সাধারণ মানুষের মনোভাবও এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন, তাঁদের কাছে এটি পরিবর্তনের সুযোগ হতে পারে। আবার শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকদের কাছে এটি শহিদের মৃত্যু হিসেবে আবেগের বিস্ফোরণও ডেকে আনতে পারে। ফলে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অতএব, এই ঘটনা শুধুমাত্র একজন নেতার মৃত্যু নয় এটি ইরানের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং বিশ্ব কূটনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। এখন সবার নজর তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সময়ই বলবে, এই অধ্যায় নতুন সূচনা লিখবে, নাকি আরও অস্থিরতার ইতিহাস রচনা করবে।
