মধুচন্দ্রিমা যখন সাতগুরুং-এর হাত ধরে
শমীক মন্ডল
প্রকৃতি যে কত সুন্দর,মনোমোহিনী তা দেখার আবার সুযোগ এসে গেল। চিত্রসাংবাদইকতার জন্য বেশ কিছু অপরিচিত জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। আর যখনই যাই শুধু মনে হয় এখানে যদি বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দু-দিন বেড়িয়ে পড়া যেত তাহলে জমত। কারণ খুব কম খরচে প্রকৃতির স্বাদ পেতে দুয়ারসিনি একেবারে অনবদ্য জায়গা।
ঘাটশিলা আর গালুডি আমাদের ভ্রমণ মানচিত্রে খুব পরিচিত নাম। এই পরিচিত জনকোলাহল ছেড়ে আরেকটু এগিয়ে গেলেই প্রকৃতি শুধু আপনার নিজের। ছোট টিলা দূরে পাহাড়ের সারি,লাল মাটি,সবুজ বন আর সুর তোলা পাহাড়ি নদী শুধু আপনার। একেত ভালোবাসার লোকের অভাব।
গালুডি টুরিস্ট কমপ্লেক্সের সামনে থেকে সকাল দশটা নাগাদ বাস ছাড়ে নরসিংহপুরের উদ্দেশ্যে। দুরত্ব ১৪ কিলোমিটার। নরসিংহপুর থেকে দুয়ার সিনি মাত্র ৪ কিলোমিটার। বনের মধ্যে দিয়ে এই পথে একটা ছোট্ট ট্রেকিং করে পৌঁছানো যায় দুয়ারসিনির বনবাংলোয়। এছাড়া কোলকাতা থেকে চলে আসুন পুরুলিয়ার বান্দোয়ানে। বান্দোয়ান থেকে ট্রেকারে পথে দুয়ারসিনি মাত্র ১৪ কিলোমিটার। সঙ্গে যদি মালপত্র কম থাকে তাহলে অনায়াসে হেঁটে আসা যায়।
দুয়ারসিনি নামটা নিয়ে এখনকার সাঁওতালবাসীদের মধ্যে একটা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এখানে সিনিবাবা বলে এক সাধক পিড়ের বসবাস ছিলো। আর সামনে ছিলো দুটো বিশাল পাহাড়। প্রকৃতির রোষে দুটো পাহাড় একসঙ্গে মিশে গিয়ে দুটো গ্রামকে আলাদা করে দিচ্ছিল। সিনিবাবার কৃপায় পাহাড় দুটি একটা দুয়ার বা দরজার ন্যায় ফাঁক রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে এর নাম হয় দুয়ারসিনি।
লালমাটির কাঁচা-রাস্তা পেরিয়ে দুয়ারসিনির প্রকৃতি ভ্রমণ কেন্দ্র। নির্জন পাহাড়ের কোলে মাটির ঘরের মতো আকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি বিলাসবহুল কটেজ। এদের বয়স বেশি নয় তাই যথেষ্ট পরিষ্কার এবং নতুন। অত্যাধুনিক বাথরুম থেকে শুরু করে মশারির ব্যবস্হা সবই আছে এদের। খাওয়া দাওয়ার জন্য একটা ছোট্ট ভোজনালয় রয়েছে।
বাংলো থেকে আধ কিলোমিটার দূরে প্রতি শনিবার বিকেলের হাট বসে। গ্রামের মানুষের এটাই একমাত্র ভরসা। মুরগি,ছাগল থেকে শুরু করে মহুয়ার ফল আবার চুল-দাড়ি কাটবার দোকান পাওয়া যাবে এই অস্হায়ী হাটে।
দুয়ারসিনির চারদিকে শুধু পাখির ডাক আর সবুজে ভরা। বাংলো থেকে একটু এগিয়ে জঙ্গলের আড়ালে কলকল কলকল করে বয়ে চলেছে সাতগুরুং নদী। বর্ষায় উত্তাল আর শীতে শীর্ণকায়। পাশে একটা উদ্দাম পাহাড়ি ঝোড়া আছে। পথ একেবারে নির্জন। জঙ্গলের কাছে বুনো জাম,হরিতকি,আর প্রচুর মহুয়া ও ভেষজ উদ্ভিদ। দূরে পাহাড়ের সারিগুলো দলমা। ফসল পেকে উঠলেই হাতির তাণ্ডব চলে গ্রামে গ্রামে। এছাড়া বুনো কুকুর,খরগোস,বনমুরগি আর সাপের দেখা মেলে অতি সহজে। যদি পৌষ সংক্রান্তিতে আসা যায় তাহলে বান্দোয়ানে মেলা দেখা যাবে। এক কথায় দুয়ারসিনি একটা ক্যানভাসে আঁকা ছবি। যার সবকিছুই সুন্দরভাবে সাজানো অরণ্যপ্রেমীদের জন্য।
