বিমান দুর্ঘটনায় মৃত মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার …..
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা:- বুধবার সকালে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী ও এনসিপি নেতা অজিত পাওয়ারের। মহারাষ্ট্রের বারামতিতে ভেঙে পড়ে একটি চার্টার্ড প্রাইভেট বিমান। সেই বিমানে অজিত পাওয়ারের সঙ্গে ছিলেন তাঁর এক দেহরক্ষী, এক মহিলা সহকর্মী এবং দুই পাইলট। ডিজিসিএ (ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন) সূত্রে খবর, বিমানে থাকা পাঁচ জনেরই মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই দেশজুড়ে শোকের আবহ। শুরু হয়েছে দুর্ঘটনার কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্ত।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বিমানটি বারামতি বিমানবন্দরে নামার চেষ্টা করছিল। কিন্তু প্রথমবার অবতরণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর পাইলট ইমারজেন্সি ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি চান। একটি সূত্রের দাবি, সেই সময় পাইলট ‘মে ডে কল’-ও করেছিলেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি বারামতি বিমানবন্দরের কাছের পাহাড়ি এলাকায় মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ভেঙে পড়ার মুহূর্তেই বিমানের সামনের অংশে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণ বিমানটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারের জন্য তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ফ্লাইট রেডারের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার ঠিক আগে বিমানটি প্রায় ২৬০০ ফুট উচ্চতায় ছিল। হঠাৎ করেই বিমানের উচ্চতা দ্রুত কমতে শুরু করে। সেই সময় বিমানের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৫৩ কিলোমিটার।
প্রাথমিক সূত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনার কথা উঠে আসছে। জানা গিয়েছে, অবতরণের সময়ই বিমানে প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দেয়। তার জেরেই পাইলট নিয়ন্ত্রণ হারান এবং ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। যদিও ডিজিসিএ জানিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সূত্রের খবর, জেলা পরিষদ ও পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচনী প্রচারের জন্য বুধবার সকালে মুম্বই থেকে বিমানে করে বারামতির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার। এদিন বারামতিতে তাঁর তিনটি জনসভা করার কথা ছিল। বিমানটি বারামতি বিমানবন্দরের কাছেই একটি খোলা মাঠে ভেঙে পড়ে। পাহাড়ি এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটায় উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছতে কিছুটা সময় লেগেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
এই দুর্ঘটনার পর প্রথমে অজিত পাওয়ারকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা জানা গেলেও পরে ডিজিসিএ নিশ্চিত করে, বিমানে থাকা সকলেরই মৃত্যু হয়েছে। অজিত পাওয়ারের বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা দেশ শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। ঘটনার পর এক্স হ্যান্ডেলে শোকপ্রকাশ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লেখেন, “অজিত পওয়ারের আকস্মিক মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত এবং স্তম্ভিত। আজ সকালে বারামতীতে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর সহযাত্রীদের মৃত্যু হয়েছে। এ এক বিরাট ক্ষতি।”
তিনি অজিত পাওয়ারের কাকা শরদ পাওয়ার ও তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং ঘটনার যথাযথ তদন্তের দাবি করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও শোক প্রকাশ করেন। তার আগে তিনি মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীশের সঙ্গে ফোনে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত খোঁজ নেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী লেখেন, “অজিত পাওয়ার ছিলেন একজন জননেতা। তৃণমূল স্তর পর্যন্ত তাঁর গভীর যোগাযোগ ছিল। মহারাষ্ট্রের জনগণের সেবায় তিনি সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। পরিশ্রমী ও সর্বজন সম্মানিত এই নেতার মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক।” তিনি অজিত পাওয়ারের প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দরিদ্র ও নিপীড়িতদের ক্ষমতায়নের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সহ বহু কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের নেতা শোকপ্রকাশ করেছেন।
বারামতি কখনও তাঁকে খালি হাতে ফেরায়নি। পরপর সাতবার এখান থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন অজিত পাওয়ার। তারও আগে ১৯৯১ সালে লোকসভা নির্বাচনেও বারামতি থেকেই জয়লাভ করেন। অথচ সেই বারামতিতেই তাঁর বিমানের মর্মান্তিক পরিণতি। যেখান থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উত্থান, সেখানেই যেন জীবননাট্যের যবনিকা পতন। এই পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না বারামতির মানুষ। ‘দাদা’ নামেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন তিনি। প্রায় সাড়ে চার দশকের রাজনৈতিক কেরিয়ার, আরবসাগরের তীরবর্তী রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক মুখের এমন মৃত্যু সত্যিই ইন্দ্রপতন।
অজিত পাওয়ার বিশ্বাস করতেন ‘শিব–শাহু–ফুলে–আম্বেদকর’ আদর্শে। অর্থাৎ ছত্রপতি শিবাজি, রাজর্ষি শাহু মহারাজ, জ্যোতিরাও ফুলে এবং ড. বি আর আম্বেদকরের চিন্তাধারাই ছিল তাঁর পথচলার অনুপ্রেরণা।
মাত্র ২৩ বছর বয়সে, ১৯৮২ সালে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু। সামনে ছিলেন কাকা শরদ পাওয়ার। চিনি কারখানার সমবায় বোর্ডের সদস্য হিসেবে শুরু করে এক দশক পরে পুণে জেলা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান হন। ১৯৯১ সালেই প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হন বারামতি থেকেই।
অজিত পাওয়ারের প্রয়াণের পর আবার আলোচনায় উঠে এসেছে কাকা শরদ পাওয়ারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের উত্থান-পতন। প্রায় তিন বছর আগে শরদ পাওয়ারের থেকে আলাদা হয়ে নিজের দল গড়েন অজিত। আইনি লড়াই জিতে এনসিপির ঘড়ি প্রতীকও তাঁর দখলে আসে।
যদিও লোকসভা নির্বাচনে শরদ পাওয়ার শিবির এগিয়ে থাকলেও বিধানসভা নির্বাচনে অজিত পাওয়ারের শিবির ৪১টি আসনে জয়লাভ করে, যেখানে শরদের দল পায় ১০টি আসন। এরপর থেকেই দুই এনসিপি এক হওয়ার জল্পনা শুরু হয়। সাম্প্রতিক পুর নির্বাচনে পুণে ও পিম্পরি-চিঁচওয়াড়ে বিজেপি-শিবসেনার বিরুদ্ধে দুই শিবির একসঙ্গে লড়াই করায় সেই জল্পনা আরও জোরদার হয়।
বছরের শুরুতে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে অজিত পাওয়ার বলেছিলেন, “আপ কে মু মে ঘি-শক্কর”—আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। শরদ পাওয়ারের কন্যা সুপ্রিয়া সুলে ও অজিত পাওয়ারের মধ্যে আলোচনা চলছিল বলেও শোনা গিয়েছিল।
কিন্তু সব জল্পনা, সব সম্ভাবনা থেমে গেল বুধবার সকালের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায়।
যে বারামতি থেকে অজিত পাওয়ারের রাজনৈতিক জীবনের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল, সেই বারামতির মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। কাকার সঙ্গে পুনর্মিলনের সম্ভাবনাকে চিরদিনের জন্য জিইয়ে রেখেই।
