উৎসবে অমানবিকতা রুখতে কেরলের মন্দিরে এবার ‘রোবট হাতি’!
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কেরালা: কেরলের ত্রিশূরের ভাড়াক্কুনাথন মন্দিরের বিখ্যাত ‘পূরম উৎসব’ হোক বা গুরুভায়ুর শ্রীকৃষ্ণ মন্দির—রাজকীয় সাজে ১০০ হাতির শোভাযাত্রা দেখতে প্রতি বছরই নামে লাখো মানুষের ঢল। কিন্তু উৎসবের এই জাঁকজমকের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম সত্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভারী সজ্জা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, বাজির মুহুর্মুহু শব্দ আর তীব্র গরমে হাতিরা মারাত্মক মানসিক চাপে ভোগে। যার জেরে ২০২৪ সালে কেরলে উৎসব চলাকালীন হাতির আক্রমণে অন্তত ৯ জন নিহত হন। প্রাণীকল্যাণ সমিতিগুলির দীর্ঘদিনের প্রতিবাদের পর, এবার এই অমানবিক রীতিতে বদল আনতে এক অভিনব উদ্যোগ নিল ‘পেটা ইন্ডিয়া’ ।
ঐতিহ্যবাহী আচারকে অক্ষুণ্ণ রেখে বন্যপ্রাণের ওপর অত্যাচার বন্ধ করতে কেরলের বিভিন্ন মন্দিরে ইতিমধ্যে ৪০টি রোবট হাতি দান করেছে পেটা ইন্ডিয়া।
ঠিক কেমন এই রোবট হাতি…?
লোহা এবং রাবার দিয়ে তৈরি এই রোবট হাতিগুলো আসল হাতির মতোই কান নাড়াতে, লেজ দোলাতে এবং শুঁড় দিয়ে জল ছিটাতে পারে। তবে নির্মাতারা জানিয়েছেন, আসল হাতির হাঁটার নিখুঁত ভঙ্গিটি এখনও এই রোবটে পুরোপুরি রপ্ত করা সম্ভব হয়নি, যা ভবিষ্যতে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রতিটি রোবট হাতি তৈরি করতে খরচ পড়ছে প্রায় ৬ হাজার মার্কিন ডলার। রোবট হাতির অন্যতম নির্মাতা প্রশান্ত প্রকাশন এক সাক্ষাৎকারে জানান, রক্তমাংসের আসল হাতির বিকল্প তৈরি করা অসম্ভব। তবে তাঁরা চেষ্টা করেছেন যাতে উৎসবের মাঠে হাতির সৌন্দর্য এবং রাজকীয় উপস্থিতি যতটা সম্ভব ফুটিয়ে তোলা যায়।
“গ্রন্থে জীবন্ত হাতি বাধ্যতামূলক নয়”, উদ্যোগকে সাধুবাদ পুরোহিতদের
কেরলের বেশ কিছু মন্দিরের পুরোহিতরা পেটা-র এই পদক্ষেপকে খোলা মনে স্বাগত জানিয়েছেন। ইরিঞ্জাদাপিল্লি শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রাজকুমার নাম্বূদিরি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, “আমাদের কোনো ধর্মীয় গ্রন্থে কোথাও উৎসবের জন্য জীবন্ত হাতি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক বলা নেই। বর্তমানের এই কংক্রিটের শহর, তীব্র গরম আর কানফাটানো শব্দের মধ্যে অবলা একটা প্রাণীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা আসলে অমানবিকতারই পরিচায়ক।”
ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা: ক্ষুব্ধ ঐতিহ্যপন্থীরা
তবে প্রযুক্তির এই ছোঁয়াকে সহজে মেনে নিতে পারছেন না কেরলের রক্ষণশীল ঐতিহ্যপন্থীদের একাংশ। তাঁদের দাবি, হাতি শুধুমাত্র কোনো উৎসবের প্রদর্শনী বা সাধারণ প্রাণী নয়; সনাতন ধর্মে হাতিকে অত্যন্ত পবিত্রতার প্রতীক মনে করা হয়। তাই মেকানিক্যাল বা রোবট হাতি কখনোই জীবন্ত হাতির ধর্মীয় গুরুত্ব ও আধ্যাত্মিক আবেগের বিকল্প হতে পারে না।
পরিবর্তনের পথে কেরালা?
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, কেরলের বিভিন্ন মন্দিরে আজও ৪০০-এর বেশি হাতি বন্দি অবস্থায় রয়েছে। ফলে রাতারাতি শতাব্দী প্রাচীন এই প্রথা বা মানসিকতা বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তবে পেটা-র এই ৪০টি রোবট হাতির আগমন কি দীর্ঘমেয়াদে কেরলের উৎসবের চেনা ছবিটা বদলে দিতে পারবে? উত্তরটা অবশ্য সময়ই দেবে।
