রথযাত্রায় বাধা! ইসকনকে পাঠানো চিঠিতে লুকিয়ে কোন গভীর রহস্য?
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, নিউজ ডেস্ক : শাস্ত্রনির্ধারিত দিনক্ষণ এড়িয়ে বছরের অন্য সময়ে রথযাত্রা ও স্নানযাত্রা আয়োজন করা যাবে না—বিশ্বজুড়ে রথযাত্রা উদযাপনের ক্ষেত্রে ইসকনকে এই মর্মে কড়া বার্তা দিলেন পুরীর গজপতি মহারাজা দিব্যসিংহ দেব। পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দির পরিচালন কমিটির চেয়ারম্যান গজপতি মহারাজা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভিন্ন ভিন্ন তারিখে রথযাত্রার আয়োজন করায় বিশ্বজুড়ে থাকা ভগবান জগন্নাথের কোটি কোটি ভক্তের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগছে। এই বিষয়ে ইসকন গভর্নিং বডি কমিশনের (GBC) চেয়ারম্যান মধুসেবিতা দাস প্রভুকে মায়াপুরে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠিয়েছেন তিনি।
আপত্তির মূলে কী? কেন ক্ষুব্ধ গজপতি মহারাজা?
চলতি ২০২৬ সালে পুরীর মূল রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আগামী ১৬ জুলাই। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। কিন্তু গজপতি মহারাজার অভিযোগ, পুরীর রথযাত্রার নির্ধারিত দিনের অনেক আগেই ইসকন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রথযাত্রার আয়োজন করে ফেলেছে।
-
বিদেশের রথযাত্রা: সম্প্রতি কেনিয়ার নাইরোবিতে রথযাত্রা করেছে ইসকন। তার আগে ২১ জুন লন্ডনে, ১৪ জুন নিউ ইয়র্ক সিটিতে এবং ৫ জুলাই সিডনিতেও রথযাত্রার শোভাযাত্রা করা হয়েছে, যা শাস্ত্রসম্মত তিথির অনেক আগে।
-
স্নানযাত্রার তারিখ নিয়েও বিবাদ: ২০২৬ সালে পুরীর স্নান পূর্ণিমা পালিত হয়েছে ২৯ জুন। কিন্তু ইসকন ১ মে-র পর থেকেই বিভিন্ন দেশে স্নানযাত্রা করা শুরু করে। চিঠির সঙ্গে এমন স্নানযাত্রার একটি তালিকাও জুড়ে দিয়েছেন মহারাজা।
-
মধ্যপ্রদেশের ৬৬ জায়গায় রথযাত্রার পরিকল্পনা: মধ্যপ্রদেশে ইসকন উজ্জয়িনীর পক্ষ থেকে ১৬ জুলাই থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যের ৬৬টি ভিন্ন জায়গায় রথযাত্রা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গজপতি মহারাজার আপত্তি, রথযাত্রা একটি নির্দিষ্ট ৯ দিনের উৎসব। আলাদা আলাদা দিনে ইচ্ছেমতো এর আয়োজন করা যায় না।
“দিন নির্ধারণ করেছিলেন স্বয়ং জগন্নাথ”
গজপতি মহারাজা দিব্যসিংহ দেব তাঁর চিঠিতে স্কন্দ পুরাণের উল্লেখ করে জানান, মহর্ষি বেদব্যাস রচিত এই পুরাণে স্পষ্ট বলা আছে যে, স্বয়ং ভগবান জগন্নাথ নিজের স্নানযাত্রা এবং রথযাত্রার দিন নির্ধারণ করেছিলেন। রথযাত্রা কোনো সাধারণ সামাজিক শোভাযাত্রা নয়, এটি গভীর ধর্মীয় বিধি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের অঙ্গ। তাই সুবিধামতো দিনে এই উৎসব পালন করা জগন্নাথ সংস্কৃতির পরিপন্থী। চিঠিতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসকনের নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করারও আবেদন জানান তিনি, যেখানে বিদেশের মন্দিরগুলোকে আলাদা দিনে রথ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
কী যুক্তি দিচ্ছে ইসকন?
এই বিতর্কে ইসকনের নিজস্ব কিছু বাস্তবসম্মত যুক্তি রয়েছে। পুরীর মন্দির প্রশাসনের আপত্তির জবাবে এর আগে ইসকন জানিয়েছিল, বিশ্বের সব দেশে আবহাওয়া, সরকারি নিয়ম এবং স্থানীয় আইন এক নয়। ফলে একই দিনে সর্বত্র উৎসব করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ রাশিয়ার মতো দেশে চরম আবহাওয়া, কড়া সরকারি বিধিনিষেধ এবং স্থানীয় পরিস্থিতির কারণে শাস্ত্রে নির্ধারিত তিথিতে রথযাত্রা করা সম্ভব হয় না। তাই বাধ্য হয়েই স্থানীয় পরিস্থিতি বুঝে দিন ঠিক করতে হয়।
পুরোনো বিতর্ক ও পুরীর বর্তমান প্রস্তুতি
রথযাত্রার দিনক্ষণ নিয়ে গজপতি মহারাজা এবং ইসকনের এই মতপার্থক্য নতুন নয়। এর আগে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও ইসকনকে পুরীর পঞ্জিকা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের রথযাত্রার ঠিক আগে এই বিতর্ক নতুন করে তুঙ্গে উঠেছে।
এদিকে, এই সমস্ত বিতর্কের মাঝেই পুরীতে ১৬ জুলাইয়ের মূল রথযাত্রার প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। প্রায় ২২০ জন ছুতোর মিস্ত্রি, সহকারী ও চিত্রশিল্পী দিনরাত এক করে তিন রথ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করছেন। এখন শুধু ১৬ জুলাইয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় দিন গুনছেন বিশ্বজুড়ে থাকা জগন্নাথ ভক্তেরা।
