আজকের দিনেবিশ্ব

ইতিহাসের দ্রুততম বিচার: ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ১৯ দিনের মাথায় প্রাণদণ্ড

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, ঢাকা: রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশু কে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করল ঢাকা আদালত। এই নৃশংস ঘটনায় মূল আসামি সোহেল রানা এবং সেই কাজে সহযোগিতা করার দায়ে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার—উভয়কেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। মাত্র ৫ দিনেই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণার এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত তৈরি করলো বাংলাদেশ।

রবিবার ৭ জুন বেলা পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, মাসরুর সালেকীন আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। প্রাণদণ্ডের পাশাপাশি প্রধান আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেন। রায় ঘোষণার পর সাজা পরোয়ানা দিয়ে দম্পতিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। এই রায় ঘিরে সকাল থেকেই আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন মৃত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও অপরাধের ধরণ:

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক মাসরুর সালেকীন জানান, চিকিৎসকের প্রতিবেদন, সুরতহাল এবং ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যপ্রমাণে এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, গত ১৯ মে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে শিশুটিকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। জানা গেছে, প্রধান আসামি সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার পর বাথরুমের গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। গত ২০ মে আদালতে দেওয়া নিজের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও সে এই অপরাধের কথা স্বীকার করেছিল।  ঘটনার সময় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ওই ফ্ল্যাটেই উপস্থিত ছিলেন বলে আদালত জানতে পারে। তিনি এই নৃশংস কাজে বাধা তো দেনইনি, উলটে সোহেলকে পালানোর সুযোগ করে দিতে ঘরের দরজা খুলে দিয়ে অপরাধে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। ফলে আইনি দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই সমঅপরাধে অপরাধী বলে জানায় আদালত।

মাত্র ৫ দিনেই বিচার:

বিচার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অতীতে এই ধরণের জটিল ফৌজদারি মামলার বিচার এত কম সময়ে শেষ হওয়ার কোনো নজির নেই। গত বছর মাগুরায় ‘আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা’র বিচার ১৪ কার্যদিবসে শেষ হয়েছিল, যা ছিল এতদিনের রেকর্ড। কিন্তু এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি সেই রেকর্ড ভেঙে মাত্র ৫ দিনের রায় ঘোষণা করে।।

মামলা ও বিচারের ঘটনাক্রম:

  • ১৯ মে, ২০২৬: পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার হয়। ফ্ল্যাট থেকে স্বপ্না কে আটক করা হয়। এবং সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ থেকে সোহেল কে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিনই রামিসার বাবা একটি মামলা করেন। নৃশংস এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুটির পরিবারের সাথে দেখা করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন।

  • ২৪ মে (৫ম দিন): মাত্র ৫ দিনের মাথায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। মামলাটির দ্রুত শুনানির জন্য আদালতের অবকাশকালীন ছুটিও বাতিল করা হয়।

  • ১ জুন: ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়।

  • ২ জুন: মাত্র ১ দিনে ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন।

  • ৩ জুন: আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন। যেখানে স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও সোহেল রানা ক্ষমা চেয়ে মুক্তির আর্জি জানায় ।

  • ৪ জুন: রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়।

  • ৭ জুন (১৯তম দিন): চূড়ান্ত রায় ঘোষণা জানায় আদালত।

আদালত ও চিকিৎসকদের তৎপরতা এবং পুলিশের দ্রুত তদন্তের কারণেই ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ভুক্তভোগী পরিবারটি সুবিচার পেল, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *