আজকের দিনেতিলোত্তমা

‘অসুস্থ স্ত্রীকে ত্যাগ করা যায় না!’ ৪.৫ বছর পর বধূকে বাড়ি ফেরাল হাই কোর্ট

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,কলকাতা: “আইনত বৈধ স্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বামী কখনই পিঠটান দিতে পারেন না।”— এক মর্মান্তিক মামলার শুনানিতে এমনই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাই কোর্টের। পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়ে বিগত সাড়ে চার বছর ধরে যিনি হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন, অবশেষে আদালতের কড়া হস্তক্ষেপে নিজের বাড়িতে ফিরলেন সেই বধূ। একই সঙ্গে তাঁর চিকিৎসার কোটি টাকার বিলও মকুব করে দিয়েছে আদালত।

 স্কুটি দুর্ঘটনা এবং আমহার্স্ট স্ট্রিটের পুনমের ট্র্যাজেডি

কলকাতার বাসিন্দা পুনম গুপ্ত ও তাঁর স্বামী জয়প্রকাশ (লোহার ছাঁটের ব্যবসায়ী)। বেশ কয়েক বছর আগে স্বামীর সঙ্গে স্কুটিতে যাওয়ার সময় আমহার্স্ট স্ট্রিটে ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে পড়েন পুনম। স্কুটি থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গভীর চোট পান তিনি। প্রথমে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ এবং পরে বাইপাসের ধারের এক বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় তাঁকে। চিকিৎসার পর পুনম কথা বলা বা চলাফেরার ক্ষমতা হারালেও, চিকিৎসকদের মতে তিনি ইশারায় সাড়া দেন এবং নিজে খাওয়া-দাওয়া করতে পারেন। ফলে বাড়িতে রেখেই তাঁর চিকিৎসা চালানো সম্ভব ছিল।

 দায়িত্ব নিতে অস্বীকার স্বামীর, বিল বাড়ল ১ কোটিরও বেশি!

বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, শারীরিক অক্ষমতা তৈরি হতেই স্ত্রী পুনমকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন স্বামী জয়প্রকাশ। শুধু তাই নয়, এক সময় হাসপাতালের বিল মেটানোও পুরোপুরি বন্ধ করে দেন তিনি।

  • বকেয়া বিল: ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ বিল বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা!

  • প্রদত্ত অর্থ: এর মধ্যে বিমা সংস্থা দেয় মাত্র ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা এবং রোগীর পরিবার দেয় মাত্র ১৫ হাজার টাকা।

  • আইনি লড়াই: বাধ্য হয়ে ২০২২ সালে থানায় অভিযোগ জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে ২০২৪ সালে তারা ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিকাল এস্টাব্লিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশন’-এর দ্বারস্থ হয় এবং পরবর্তীতে কমিশনের পরামর্শেই মামলা পৌঁছায় কলকাতা হাই কোর্টে।

 “হোমে পাঠানো যাবে না”, আদালতে কড়া পর্যবেক্ষণ বিচারপতির

আদালতে দাঁড়িয়ে স্বামী জয়প্রকাশ দাবি করেন, তাঁর পক্ষে শয্যাশায়ী স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে দেখভাল করা সম্ভব নয়। তাঁকে কোনো সরকারি হাসপাতাল বা হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের বেঞ্চ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে রোগীর অবস্থা খতিয়ে দেখেন। এরপরই স্বামীকে কড়া বার্তা দিয়ে পুনমকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত।

হাই কোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ:

  • বিশেষ শারীরিক ক্ষমতাসম্পন্ন এবং মানসিকভাবে অসুস্থদের জন্য হোম, সবার জন্য নয়।

  • কোনো পরিবারে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী বা ভাই-বোন অসুস্থ হলেই তাঁকে হোমে পাঠিয়ে পরিত্যাগ করা যায় না। এতে সরকারের ওপর অযথা চাপ বাড়বে।

  • পুনমের একটি ১৭ বছরের সন্তান রয়েছে। মাকে হোমে পাঠালে সেই সন্তান মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে।

সাড়ে চার বছর পর ঘরের মেয়ে ঘরে

হাই কোর্টের এই মানবিক ও কঠোর নির্দেশের পর, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে অবশেষে সাড়ে চার বছর পর আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে ফিরলেন পুনম গুপ্ত। আদালতের নির্দেশে তাঁর ১ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া বিল পুরোপুরি মকুব করে দেওয়া হয়েছে। আদালতের এই রায় সমাজে পারিবারিক দায়িত্ববোধের এক বড় নজির হয়ে থাকবে বলে মনে করছে আইন মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *