আজকের দিনেভারত

জঙ্গল সাফারিতে নিষিদ্ধ মোবাইল ফোন ! নির্দেশ সর্বোচ্চ আদালতের

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,নিউজ ডেস্ক:- ভারতের অরণ্য ভ্রমণ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এক নজিরবিহীন এবং ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) একটি যুগান্তকারী রায়ের পর, দেশের একাধিক বিখ্যাত ব্যাঘ্র প্রকল্পের (Tiger Reserves) কোর ট্যুরিজম জোনের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে জঙ্গলে সাফারিতে যাওয়ার আগে পর্যটকদের প্রবেশদ্বারে ফোন জমা রেখে যেতে হবে, অথবা সাফারির পুরো সময়টা ফোন সম্পূর্ণ বন্ধ (Switched Off) করে ব্যাগের ভেতরে রেখে দিতে হবে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং পর্যটকদের সুরক্ষার স্বার্থে এই কঠোর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন এই কড়া সিদ্ধান্ত? সুপ্রিম কোর্টের রায়ের নেপথ্যে ৪টি মূল কারণ:

দীর্ঘদিন ধরেই এক শ্রেণীর পর্যটকদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে জঙ্গলের শান্ত পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল। স্মার্টফোনের অপব্যবহারের ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলো সুরক্ষিত বাসস্থানের বদলে কোলাহলপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল। মূলত যে ৪টি কারণে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো:

১. শব্দদূষণ ও পশুর স্বাভাবিক জীবনে ব্যাঘাত: সাফারি গাড়িতে বসে জোরে জোরে ফোনে কথা বলা, রিলস বা ভিডিও চালানো এবং বাঘ দেখার পর অন্য গাড়িকে ডেকে চিৎকার করার মতো ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ ছাড়া, কম আলোয় বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া রুখতে নাইট সাফারিও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২. বিপজ্জনক সেলফি-ম্যানিয়া: বাঘের সঙ্গে সেলফি তোলা বা খুব কাছ থেকে ফুটেজ নেওয়ার চক্করে পর্যটকদের গাড়ির বাইরে বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বাড়ছিল। এমনকী অনেক সময় হাত থেকে ফোন নিচে পড়ে গেলে, পর্যটকরা হিংস্র পশুর সামনেই গাড়ি থেকে নেমে সেই ফোন তুলতে যাচ্ছেন। গাইডদের বয়ান অনুযায়ী, বাঘের ছবি তোলার তাড়াহুড়োয় চলন্ত জিপ থেকে এক শিশুর নিচে পড়ে যাওয়ার মতো ভয়ঙ্কর ঘটনাও ঘটেছে।

৩. হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও গাড়ির জটলা: সাফারি গাড়ির চালক এবং গাইডদের নিজস্ব হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থাকে। জঙ্গলের কোথাও বাঘ দেখা গেলেই সেই গ্রুপে ‘সাইটিং অ্যালার্ট’ চলে যায়। ফলে সব গাড়ি দ্রুত গতিতে একই জায়গায় ছুটে আসে এবং সেখানে পর্যটকদের গাড়ির এক বিশাল জটলা বা ট্রাফিক জ্যাম তৈরি হয়, যা বাঘের স্বাভাবিক চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করে।

৪. জিওট্যাগিং ও চোরাশিকারিদের বিপদ: সোশ্যাল মিডিয়ায় বাঘের ছবি পোস্ট করার সময় পর্যটকরা প্রায়শই ‘জিওট্যাগ’ বা লাইভ লোকেশন ব্যবহার করেন। এর ফলে চোরাশিকারিদের যেমন সুবিধা হয়, তেমনই বাঘের জল খাওয়ার গোপন আস্তানাগুলো রাতারাতি ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত হচ্ছিল। প্রসঙ্গত, গত ৫ বছরে ভারতে বাঘের হামলায় প্রায় ৪১৮ জন মানুষের অনভিপ্রেত মৃত্যু হয়েছে, যার অন্যতম কারণ বন্যপ্রাণীর খুব কাছাকাছি চলে যাওয়া।

সাফারির নতুন নিয়মাবলী:

জায়গা ভেদে নিয়মে সামান্য তারতম্য রয়েছে—

  • কিছু কিছু ব্যাঘ্র প্রকল্পে ঢোকার মুখে লকারে ফোন জমা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

  • অন্য কিছু পার্কে ফোন ভেতরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও, তা সাফারির পুরো সময় সম্পূর্ণ ‘সুইচড অফ’ রাখতে হবে।

  • তবে জরুরি অবস্থা এবং সুরক্ষার স্বার্থে শুধুমাত্র সাফারি গাড়ির চালক ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত গাইডদের সঙ্গে ফোন রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যেই কোন কোন ব্যাঘ্র প্রকল্পে ফোন নিষিদ্ধ হয়েছে?

প্রাথমিক তালিকায় দেশের এই ৪টি হাই-প্রোফাইল অরণ্যকে রাখা হয়েছে:

১. রণথম্ভোর জাতীয় উদ্যান (রাজস্থান)

২. সরিস্কা ব্যাঘ্র প্রকল্প (রাজস্থান)

৩. জিম করবেট জাতীয় উদ্যান (উত্তরাখণ্ড)

৪. তাডোবা অন্ধেরি ব্যাঘ্র প্রকল্প (মহারাষ্ট্র)

বনদপ্তরের আশা, সুপ্রিম কোর্টের এই কঠোর নির্দেশিকার ফলে জঙ্গলে মানুষের অহেতুক দাপট কমবে এবং বন্যপ্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক ও শান্ত পরিবেশ ফিরে পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *