ভাঙা সাইকেলেই কেল্লাফতে ! ডুয়ার্সের ছেলে গোটা দেশ কাঁপাল
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা,আলিপুরদুয়ার:- ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। একটি দামি সাইকেল কেনার সামর্থ্য নেই। কিন্তু অদম্য ইচ্ছেশক্তি আর একটি ‘লজঝরে’ পুরোনো সাইকেলকে সঙ্গী করেই জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জিতে নিয়েছেন আলিপুরদুয়ারের কালচিনির গোকুল রাই। এক সময়ে যে ছেলেকে কেউ চিনতেনই না, সেই ২৬ বছরের গোকুলই এখন গোটা ডুয়ার্সের বুকে এক ‘সেলিব্রিটি’। প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে মানুষ আসছেন সংবর্ধনা দিতে, পাশে বসিয়ে তুলছেন সেলফি।
অভাবের সংসার ও টিউশনির টাকায় পড়াশোনা
কালচিনি ব্লকের পূর্ব সাঁতালিবস্তির বাসিন্দা গোকুল আলিপুরদুয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করছেন (চতুর্থ সেমিস্টার)। তাঁর বাবা দিল্লিতে গাড়ি চালান। বাড়িতে মা, ভাই, কাকু এবং কাকিমা রয়েছেন। চরম আর্থিক অনটনের সংসারে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির পড়ুয়াদের ইংরেজি শেখান গোকুল। ছোটবেলা থেকেই সাইকেল চালানোর প্রতি একটা আলাদা ভালোবাসা ছিল তাঁর, তবে সেই ভালোবাসাই যে তাঁকে একদিন এই পরিচিতি এনে দেবে তা তিনি ভাবেননি।
গোকুলের ঝুলিতে ‘আল্ট্রা সাইক্লিস্ট’-এর খেতাব ও অনন্য রেকর্ড
ফ্রান্সের ‘অডেক্স প্যারিসিয়ান ক্লাব’ প্রতি বছর বিশ্বের সাইক্লিস্টদের জন্য বিশেষ খেতাব দেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটানা ২০০, ৩০০, ৪০০ এমনকী ৬০০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে সেই মর্যাদাপূর্ণ ‘আল্ট্রা সাইক্লিস্ট’-এর খেতাব নিজের ঝুলিতে পুরেছেন গোকুল। গোটা উত্তরবঙ্গে এই খেতাব একমাত্র তাঁরই আছে। তাঁর অন্যান্য কিছু বড় সাফল্য ও রেকর্ড হলো:
-
‘মিশন চন্দ্রযান’-এ স্বর্ণপদক: গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কলকাতার ‘সাইকেল গ্রো নেটওয়ার্ক’-এর তরফে ৮০ দিনের একটি জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। ‘মিশন চন্দ্রযান’ নামের সেই প্রতিযোগিতায় সারা ভারতের ২৪২ জন প্রতিযোগীর মধ্যে স্বর্ণপদক জেতেন গোকুল।
-
ভুবনেশ্বর রেসে বাজিমাত: গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ওডিশায় ‘ভুবনেশ্বর সাইক্লিং অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব’ আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ৪০ জনের মধ্যে প্রথম দশে ছিলেন তিনি।
-
চেন্নাই সফর: গত বছর চেন্নাইতে অনুষ্ঠিত ২৪ কিলোমিটার সাইকেল প্রতিযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এই যুবক।
-
২৩ ঘণ্টায় কলকাতা: চলতি বছর জানুয়ারি মাসে বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে কলকাতার দমদম বিমানবন্দর পর্যন্ত দীর্ঘ পথ সাইকেলে চেপে মাত্র ২৩ ঘণ্টায় পার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি।
নতুন সাইকেলের স্বপ্ন, কিন্তু বাধা টাকা
সাইক্লিং নিয়ে আজীবন বুঁদ হয়ে থাকতে চাওয়া গোকুল জানান, সাইকেল চালানো যেমন শরীরচর্চার জন্য ভালো, তেমনই এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচহীন। তবে প্রতিযোগিতায় আরও ভালো করার জন্য তাঁর একটি নতুন দামি সাইকেলের প্রয়োজন। কালচিনির বিধায়ক বিশাল লামা তাঁকে সাইকেল কেনার জন্য ২৪ হাজার টাকা দিয়েছিলেন, কিন্তু তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় সেই টাকা দিয়ে তিনি নিজের পুরোনো সাইকেলটিই মেরামত করিয়েছেন এবং বাকি টাকা দিয়ে বিভিন্ন স্পোর্টস ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন। সরকারি বা কোনো বড় স্তরের সাহায্য মিললে তিনি আরও অনেক দূর যেতে পারবেন বলে আশাবাদী ডুয়ার্সের এই লড়াকু যুবক।
