Travel-Chandanngar-Hooghly : আমাদের হুগলী জেলার চন্দননগরের প্রাচীন মন্দির…..
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- ফাল্গুনের রঙে ঐতিহ্যের পথে :- ফাল্গুন এলে গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দননগর যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। কৃষ্ণচূড়ার কুঁড়ি, কাশফুলের জায়গায় নতুন সবুজ, আর নদীর বুক ছুঁয়ে আসা নরম বাতাস—সব মিলিয়ে শহরটাকে মনে হয় এক বিশাল খোলা ইতিহাসের পাতা। ফরাসি আমলের স্থাপত্যের পাশাপাশি চন্দননগরের অলিগলি জুড়ে ছড়িয়ে আছে বহু প্রাচীন মন্দির, যেগুলি শুধু ধর্মীয় স্থান নয় এগুলি এই শহরের আত্মপরিচয়ের অংশ। ফাল্গুনের ছোঁয়ায় সেই মন্দিরযাত্রা হয়ে ওঠে আরও বেশি অনুভবময়।
মা বোড়াইচণ্ডী: নামের উৎস, লোককথার আলো
চন্দননগরের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছেন মা বোড়াইচণ্ডীর মন্দির। প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে এখানে মা বোড়াইচণ্ডীর পূজা হয়ে আসছে বলে জানা যায়। দেবী এখানে দুর্গার রূপে পূজিতা শক্তির প্রতীক, রক্ষাকারিণী জননী।
লোককথা অনুসারে, সিংহলে বন্দি পিতাকে মুক্ত করতে শ্রীমন্ত সওদাগর এই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লোকমুখে বয়ে চলেছে। অনেকেই মনে করেন, ‘চণ্ডী’ নাম থেকেই ‘চন্দননগর’ নামের উৎপত্তি। আবার কেউ বলেন, আগে নাম ছিল ‘চণ্ডী নগর’, যা পরে অপভ্রংশ হয়ে ‘চন্দননগর’ হয়েছে। অন্য মতে, প্রথমে ‘চন্দ্রনগর’, পরে তা ‘চন্দননগর’। বাংলা সাহিত্যের কবি বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর মনসামঙ্গল কাব্যে সরাসরি চন্দননগরের নাম উল্লেখ না করলেও ‘বোড়ো’ নামের একটি স্থানের উল্লেখ করেছেন, যা এই অঞ্চলের সঙ্গেই যুক্ত বলে মনে করা হয়।

মন্দিরের গর্ভগৃহে নিমকাঠের তৈরি এবং অষ্টধাতুর পাতে মোড়া চতুর্ভূজা দেবীমূর্তি রয়েছে। দেবীর হাতে খড়্গ, চক্র, ত্রিশূল ও শঙ্খ। তাঁর তিনটি বৃহৎ চোখ যেন ভক্তদের উপর চিরন্তন নজর রাখছে। সন্ধ্যায় প্রদীপের আলো আর ঘণ্টাধ্বনির মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হয় সময় যেন থমকে আছে।
হাওড়া থেকে ট্রেনে চন্দননগর স্টেশনে নেমে লক্ষ্মীগঞ্জ বাজার হয়ে পৌঁছানো যায় এই মন্দিরে। বিকেলে গেলে গঙ্গার দিক থেকে আসা ফাল্গুনের হাওয়া, শাঁখধ্বনি আর ধূপের গন্ধ সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটি হয়ে ওঠে একান্ত ব্যক্তিগত।
লক্ষ্মীগঞ্জের জগন্নাথ বাটি :- বোড়াইচণ্ডীর পথে পড়বে শ্রী শ্রী জগন্নাথ বাড়ি মন্দির। বাংলার ১১৭৩ সালের এই প্রাচীন মন্দির স্থানীয়ভাবে জগন্নাথদেবের উপাসনা ও রথযাত্রার জন্য সুপরিচিত। রথযাত্রার সময় গোটা এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। কাঠের রথ, শঙ্খধ্বনি, আর ভক্তদের ভিড়ে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। ফাল্গুনের নরম আলোয় মন্দিরচত্বরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ধারাবাহিকতা একইভাবে বয়ে চলেছে।
গোন্দলপাড়া: এক ঐতিহ্যবাহী পরিক্রমা গোন্দলপাড়া এলাকা যেন প্রাচীন মন্দিরের এক সংরক্ষিত অধ্যায়। এখানে রয়েছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো সিদ্ধেশ্বরী মন্দির গোন্দলপাড়া। সময়ের ছাপ পড়লেও এই মন্দির আজও স্থানীয় মানুষের ভরসাস্থল। কিছুটা এগোলেই দেখা মিলবে নীলকণ্ঠেশ্বরী মন্দির গোন্দলপাড়া–র। ১৮৩৫ শকাব্দে, ১০ জুলাই ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে (১৩২০ বঙ্গাব্দ ২৬ আষাঢ়) শিবনাথ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী শরৎকুমারী দেবী এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। উঁচু ভিত্তিবেদির উপর দক্ষিণমুখী পঞ্চশিখর শৈলীর এই মন্দির বাংলার স্থাপত্যে ইউরোপীয় প্রভাবের নিদর্শন। ইংরেজ শাসনের পর বক্রচালা ছাদের বদলে সমতল ছাদ ও কার্নিসের ব্যবহার বাড়তে থাকে এই মন্দিরেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। গর্ভগৃহের ভেতরের ছাদ গম্বুজাকৃতি। দ্বিতীয় তলার পঞ্চশিখরযুক্ত অংশটি গর্ভগৃহের আবরণ হিসেবে নির্মিত। উপরের কক্ষের দুপাশে দুটি চালামন্দির, নিচে দুটি ছোট ঘর। বাঁদিকের ঘরে ‘বাণেশ্বর’ নামের কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ নিত্য পূজিত হন। ডানদিকের ঘরটি বর্তমানে শূন্য। সামনে রয়েছে প্রশস্ত উঠোন, তিনদিকে চকমিলানো ঘর, আর কয়েকটি গাছ। চূড়া না থাকলে একে হয়তো বাসভবন বলেই মনে হত। নির্মাণে প্রায় এক লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছিল বলে জানা যায়। গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের নীলকণ্ঠেশ্বরী কালীর মূর্তি আজও নিত্য পূজিত। কাছেই রয়েছে কাছারী ঘাট—যেখানে দাঁড়িয়ে গঙ্গার জলে ফাল্গুনের আলো ঝিলমিল করে। গোন্দলপাড়াতেই রয়েছে গোপাল বাবুর শিব মন্দির স্থানীয়ভাবে পরিচিত এক প্রাচীন শিবমন্দির, যা এলাকার ধর্মীয় পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করেছে।
নন্দদুলাল: স্থাপত্যের ঐতিহ্য, চন্দননগরের ঐতিহাসিক গর্ব নন্দদুলাল মন্দির। ১৭৪০ সালে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী এই কৃষ্ণমন্দির নির্মাণ করেন। বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘দো-চালা’ স্থাপত্যরীতির অন্যতম বৃহত্তম নিদর্শন এটি। ১৭৫৭ সালে লর্ড ক্লাইভের আক্রমণের সময়ও এই মন্দির অক্ষত ছিল—যা তার ঐতিহাসিক দৃঢ়তার প্রমাণ। মন্দিরচত্বরে দাঁড়িয়ে ফাল্গুনের হাওয়া অনুভব করলে মনে হয়—ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, ইট-কাঠের গাঁথুনিতেও বেঁচে থাকে। ফাল্গুনের দিনে চন্দননগরের এই মন্দিরগুলি ঘুরে দেখা মানে কেবল ভ্রমণ নয় এ এক সময়স্রোতে ভেসে চলা। গঙ্গার ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে উপলব্ধি হয়, এই শহর শুধু অতীতকে আঁকড়ে নেই, বরং তাকে সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে। হুগলী জেলার এমন আরও কোনও প্রাচীন মন্দির আপনার জানা থাকলে অবশ্যই জানাতে পারেন।
