Budget2026-WB GOVT : ভোটের আগে কল্পতরু রাজ্য সরকার !
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- বঙ্গ বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের সূচনা হল রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের ভাষণের মধ্য দিয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃতীয় সরকারের শেষ অধিবেশন হওয়ায় এদিনের অধিবেশনের দিকে নজর ছিল গোটা রাজ্যের। দস্তুর মেনে রাজ্যপাল তাঁর ভাষণে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান তুলে ধরেন এবং নিয়ম অনুযায়ী সরকারের প্রশংসায় ভরিয়ে দেন বক্তব্য। রাজ্যপাল জানান, গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গে সেচের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে রাজ্যের সেচের আওতাভুক্ত চাষযোগ্য জমির পরিমাণ জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের কারণে স্থগিত থাকা ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান প্রকল্প রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে গ্রহণ করেছে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেই প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ করা হবে বলেও তিনি জানান। কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও রাজ্যের সাফল্যের কথা তুলে ধরে রাজ্যপাল বলেন, ধান ও পাট উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ দেশের শীর্ষস্থানে রয়েছে। কাট ফ্লাওয়ার, আনারস ও মাংস উৎপাদনে রাজ্য প্রথম স্থানে রয়েছে। সবজি, মৎস্য এবং চা উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক এবং ডিম উৎপাদনে রাজ্য বর্তমানে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে রাজ্যপালের ভাষণের শুরু থেকেই বিধানসভায় উত্তেজনার ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শাসক ও বিরোধী শিবিরের স্লোগান-পালটা স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অধিবেশন কক্ষ। রাজ্যপালের ভাষণের মধ্যেই বিরোধী বিজেপির তরফে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়, যা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়ে। ভাষণ শেষে সৌজন্যের ছবি ধরা পড়ে বিধানসভা চত্বরে। রাজ্যপাল বিধানসভা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে দেন। সঙ্গে ছিলেন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীকে হাতে হাতে ধরে কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায়। পরে অধিবেশনে ফিরে স্পিকার বিরতি ঘোষণা করেন।
অন্তর্বর্তী বাজেট পেশের আগে বিধানসভায় শুরু হয় এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) সংক্রান্ত আলোচনা। দুপুর ২টো পর্যন্ত এই বিষয়ে আলোচনার সময় নির্ধারিত হয়। এর মধ্যেই ভোটের মুখে রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। বাজেটে একের পর এক জনমুখী ও সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত ঘোষণা করে কার্যত কল্পতরু হয়ে ওঠে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। শিক্ষিত বেকার যুবসমাজের জন্য ‘বাংলার যুব সাথী’ নামে নতুন প্রকল্প চালুর কথা ঘোষণা করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী
যুবক-যুবতীরা, যাঁরা ন্যূনতম মাধ্যমিক বা সমতুল্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং রাজ্য সরকারের অন্য কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তাঁরা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত সর্বাধিক পাঁচ বছর মাসে ১৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। এই প্রকল্পটি চলতি বছরের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হবে এবং আগামী অর্থবর্ষে এর জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
ভোটের আগে রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্যও বড় ঘোষণা করা হয়। অন্তর্বর্তী বাজেটে চার শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। এর ফলে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াল ২২ শতাংশে। আগামী ১ এপ্রিল থেকেই বর্ধিত হারে ডিএ কার্যকর হবে বলে জানানো হয়। একইসঙ্গে ঘোষণা করা হয় সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথাও। উল্লেখযোগ্যভাবে, এদিনই সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যকে বকেয়া ২৫ শতাংশ ডিএ অবিলম্বে মেটানোর নির্দেশ দেয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ৬ মার্চের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। ৩১ মার্চের মধ্যে প্রথম কিস্তির টাকা মেটাতে হবে এবং ১৫ মে’র মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
বিধানসভায় দাঁড়িয়ে আনন্দপুরের নাজিরাবাদের অগ্নিদগ্ধ কারখানা চত্বরে না যাওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “ওই দিন ২৬ জানুয়ারি ছিল। আগে থেকেই বহু কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল। সারাদিন ব্যস্ততা থাকে। রাতে রাজ্যপালের ওখানেও কর্মসূচি ছিল। আমি না গেলেও মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, স্থানীয় বিধায়ক এবং অন্যান্যরা ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়েছে।” বিরোধীদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী কড়া ভাষায় বলেন, “আমাদের নিন্দা করে কিছু হবে না। বাংলা হিরো ছিল, হিরোই থাকবে। বাংলার মানুষ আপনাদের ধিক্কার জানায়।” একইসঙ্গে তিনি ফের কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে বলেন, “ডবল ইঞ্জিন সরকারের কথা বলেন, অথচ এক টাকাও কোনও প্রকল্পে দেন না।”
রাজ্যপালের ভাষণের উপর ধন্যবাদজ্ঞাপন বক্তৃতাকে কেন্দ্র করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়। শুভেন্দু তাঁর বক্তৃতায় অনুপ্রবেশ ইস্যু তুলে রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেন এবং দাবি করেন, অনুপ্রবেশের কারণে রাজ্যের ডেমোগ্রাফি বদলে যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার জন্য জমি চেয়ে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও রাজ্য সরকার সহযোগিতা করছে না। পালটা জবাবে মুখ্যমন্ত্রী ভিনরাজ্যে বাঙালিদের উপর নিগ্রহের প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করেন, “উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা, রাজস্থান, গুজরাটে যখন বাঙালিদের মারধর, নিগ্রহ, খুন হচ্ছে, তখন আপনারা কোথায় থাকেন?” তিনি আরও বলেন, আগে বাইরে থেকে কেউ এলে রেল, এভিয়েশন ও বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই তথ্য রাজ্য সরকারকে জানাত, কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
অন্তর্বর্তী বাজেটে গিগ ওয়ার্কারদের জন্যও বড় ঘোষণা করা হয়। গিগ ইকোনমির সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের মাধ্যমে তাঁরা চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত সুবিধা পাবেন। গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকারের জোরালো অবস্থান স্পষ্ট হয় বাজেটে। কেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের আবহে রাজ্য সরকারের নিজস্ব ১০০ দিনের কাজ প্রকল্প ‘মহাত্মাশ্রী’-তে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলের শ্রমিক ও কৃষকরা আরও বেশি উপকৃত হবেন বলে দাবি করা হয়।
ভোটের মুখে আশাকর্মী, সিভিক ভলান্টিয়ার, পার্শ্বশিক্ষক এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের জন্যও বড় উপহার দেয় রাজ্য সরকার। তাঁদের ভাতা ১০০০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা করা হয়। আশাকর্মীরা পাবেন ১৮০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি। কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবারকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ শ্রেণির মহিলারা এখন থেকে মাসে ১৫০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলারা মাসে ১৭০০ টাকা করে পাবেন। চলতি মাস থেকেই বাড়তি টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে।
সব মিলিয়ে ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই অন্তর্বর্তী বাজেটে একদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের বন্যা, অন্যদিকে বিধানসভায় তীব্র রাজনৈতিক তরজা দুইয়েরই ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠল। ভোটের আগে রাজ্য রাজনীতির উত্তাপ যে আরও বাড়বে, তা এদিনের বিধানসভা অধিবেশনেই স্পষ্ট হয়ে গেল।
