Budget26-Income Tax : বাজেট ২০২৬ : কর ফাঁকি ও অনিয়ম করলে কি হবে ?
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- সম্ভাবনার দেওয়াল লিখন ছিলই। শেষ পর্যন্ত সেটাই বাস্তব হল। কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬–২৭-এ ব্যক্তিগত আয়করে কোনও নতুন ছাড় বা নতুন কর স্ল্যাব ঘোষণা করলেন না কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। সরাসরি মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেওয়ার পথে না হেঁটে, এ বারও কর ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারেই জোর দিল কেন্দ্রীয় সরকার। বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, সরকারের লক্ষ্য কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তি-বান্ধব করে তোলা, পাশাপাশি কর ফাঁকি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়া।
কর অনিয়মের ক্ষেত্রে এবার শাস্তির মাত্রা অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। আয় গোপন করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিলে জরিমানার হার বাড়িয়ে বকেয়া করের ১০০ শতাংশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, আর্থিক সম্পদের মতো অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করার ক্ষেত্রেও প্রথমবারের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এতদিন এই ধরনের সম্পদের তথ্য গোপন করলে জরিমানার নির্দিষ্ট বিধান ছিল না। সরকারের মতে, কর জালিয়াতি রুখতেই এই কঠোর পদক্ষেপ। তবে একই সঙ্গে ছোট করদাতাদের জন্য স্বস্তির বার্তাও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, কর কাঠামোর জটিলতার কারণে অনেক সময় ছোট করদাতারা অনিচ্ছাকৃত ভুল করে ফেলেন। এই ধরনের ছোটখাটো কর ফাঁকিতে এবার থেকে জেলযাত্রা হবে না। পরিবর্তে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত জরিমানা দিলেই নিষ্পত্তি হবে বিষয়টি।
বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী ১ এপ্রিল থেকে চালু হতে চলেছে নতুন আয়কর আইন। নতুন আয়কর আইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা কিছু ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে। আইটিআর-১ এবং আইটিআর-২ জমার শেষ তারিখ আগের মতোই ৩১ জুলাই বহাল থাকবে। অডিট হয়নি এমন ব্যবসায়িক মামলা বা ট্রাস্টের ক্ষেত্রে ৩১ অগস্ট পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করার সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিলেটেড ও সংশোধিত আয়কর রিটার্ন জমার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিলেটেড বা সংশোধিত রিটার্ন জমা দেওয়া যেত, সেখানে এখন থেকে সামান্য ফি দিয়ে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সেই সুযোগ মিলবে। করদাতাদের সুবিধার জন্য শীঘ্রই সরলীকৃত আয়কর বিধি চালু করার কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তথ্যপ্রযুক্তি ও গবেষণা ক্ষেত্রের জন্য বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ঘোষণা করা হয়েছে। আইটি, আইটি-এনেবলড সার্ভিসেস, নলেজ প্রসেস আউটসোর্সিং এবং সফটওয়্যার-সংযুক্ত কনট্র্যাক্ট আরঅ্যান্ডডি পরিষেবাকে একটি অভিন্ন কর শ্রেণির আওতায় আনা হচ্ছে। এই সমস্ত পরিষেবার জন্য ১৫ শতাংশ ‘কমন সেফ হারবার মার্জিন’ নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের মতে, যেহেতু এই পরিষেবাগুলি প্রকৃতিগতভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, তাই এক ছাতার নীচে আনলে কর সংক্রান্ত জটিলতা কমবে এবং ব্যবসার পরিবেশ আরও অনুকূল হবে। সফটওয়্যার ও আরঅ্যান্ডডি পরিষেবায় ভারত বিশ্বনেতৃত্বে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন নির্মলা সীতারামন।
নন-রেসিডেন্টদের ক্ষেত্রেও একাধিক নতুন নিয়ম ঘোষণা করা হয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের দ্বারা ভারতে অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রির সময় এবার থেকে বাধ্যতামূলকভাবে টিডিএস কাটা হবে। একই সঙ্গে ছোট করদাতাদের জন্য ছয় মাসের বিশেষ বিদেশি সম্পদ ঘোষণার স্কিম চালু করা হচ্ছে, যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিদেশে থাকা সম্পদ বা আয় ঘোষণা করার সুযোগ পাবেন তাঁরা।
বিদেশ ভ্রমণকারীদের জন্য বাজেটে স্বস্তির খবর রয়েছে। বিদেশি ট্যুর প্যাকেজের উপর টিসিএস কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগে ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ইনসুরেন্স ক্লেম, সরকারি ক্ষতিপূরণ বা অন্য কোনও সংস্থার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনও আয়কর দিতে হবে না বলেও ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী।
চিকিৎসাক্ষেত্রেও বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্যানসার ও ডায়াবেটিস-সহ ১৭টি জীবনদায়ী ওষুধের উপর কোনও আমদানি শুল্ক আরোপ করা হবে না। ফলে এই ওষুধগুলির দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমদানি শুল্কে পরিবর্তনের ফলে স্মার্টফোনের যন্ত্রাংশ, ইভি ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, খেলার সামগ্রী, বিদেশ ভ্রমণ, সিএনজি ও কিছু নিত্যপণ্য সস্তা হতে পারে। অন্যদিকে সিগারেট, মদ, বিড়ি ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাজেটে ক্রীড়া ক্ষেত্রকে ঢেলে সাজানোর কথাও ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। আগামী এক দশকে ভারতের ক্রীড়াক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে ‘খেলো ইন্ডিয়া মিশন’-এর কথা জানানো হয়। গ্রাসরুট থেকে এলিট স্তর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক ট্রেনিং সেন্টার, ক্রীড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ এসএমই গ্রোথ ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি ও স্টার্টআপগুলিও সুবিধা পায়। পুরো বিষয়টি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস এবং ২০৩৬ অলিম্পিক্সের জন্য বিডের আগে এই ঘোষণায় খুশি ক্রীড়াপ্রেমীরা।
মহাকাশ ক্ষেত্রেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এ বছর মহাকাশ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে ৬ হাজার ১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে মহাকাশ গবেষণার জন্য। একই সঙ্গে রাঁচি ও তেজপুরে ‘নিমহ্যান্স ২’ তৈরির ঘোষণা করে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুত্ব দেওয়ার বার্তাও দিয়েছে কেন্দ্র।
সব মিলিয়ে, বাজেট ২০২৬–২৭ সরাসরি করছাড় না দিলেও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে সহজ ও স্বচ্ছ করার চেষ্টা করেছে কেন্দ্র। একদিকে যেমন কর ফাঁকি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে ব্যবসা, প্রযুক্তি, ক্রীড়া, মহাকাশ, পর্যটন ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রত্যাশিত আয়কর ছাড় না থাকায় মধ্যবিত্তের মধ্যে হতাশা থেকেই গেল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
