সাড়ে তিন কোটি বছর আগের সাপ, মিলল আধুনিক সাপের পূর্বপুরুষ
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি বছর আগে পৃথিবীতে চলছিল ‘ইওসিন’ যুগ। তখন পৃথিবী ছিল ভয়ানক গরম। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে কোনও বরফ ছিল না। আর্কটিক এলাকাতেও তখন তালগাছ আর কুমির ঘুরে বেড়াত। পৃথিবীর বেশির ভাগ জায়গা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা।
এই সময়েই ধীরে ধীরে বিকশিত হতে শুরু করেছিল আজকের অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ। হাতি, ঘোড়া, তিমির মতো প্রাণীর আদি রূপ তখন পৃথিবীতে দেখা দিতে শুরু করে।
এই প্রাণীদের সঙ্গে ছিল একটি ছোট সাপের প্রজাতি— নাম প্যারাডোক্সোফিডিয়ান রিচার্ডওয়েনি। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই ক্ষুদ্র সাপই আজকের আধুনিক সাপদের (কেনোফিডিয়ান) একটি বড় অংশের পূর্বপুরুষ। এই সাপের মেরুদণ্ডের হাড়ের গঠন আজকের সাপের সঙ্গে খুব মিল। সেই কারণেই বিজ্ঞানীদের ধারণা, এরা মূলত জলে বাস করত।
আশ্চর্যের বিষয়, এই গুরুত্বপূর্ণ ফসিল চিনতে বিজ্ঞানীদের লেগে গিয়েছে প্রায় ৪৫ বছর। ১৯৮১ সালে ফসিলটি পাওয়া গেলেও, তার আসল গুরুত্ব বোঝা যায় গত বছরের নভেম্বর মাসে। এতদিন মিউজ়িয়ামে পড়ে থাকা এই ফসিল এখন সাপের বিবর্তন নিয়ে গবেষণায় একেবারে নতুন দিক খুলে দিয়েছে।
এই ফসিলটি পাওয়া গিয়েছিল দক্ষিণ ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারের হর্ডল ক্লিফ এলাকায়। জায়গাটি আগেও জীবাশ্মের জন্য পরিচিত ছিল। প্রায় ২০০ বছর আগে এখানেই এক মহিলা জীবাশ্ম সংগ্রাহক বারবারা রডন-হেস্টিংস একটি কুমিরের খুলি খুঁজে পান। সেই কুমিরের নাম রাখা হয়েছিল ‘ডিপ্লোসাইনোডন হ্যান্টোনিয়েনসিস’। নামকরণ করেছিলেন বিজ্ঞানী রিচার্ড ওয়েন। তাঁর সম্মানেই এই সাপের নাম রাখা হয়েছে প্যারাডোক্সোফিডিয়ান রিচার্ডওয়েনি।
রিচার্ড ওয়েনের উদ্যোগেই ১৮৮১ সালে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজ়িয়াম তৈরি হয়। সেই মিউজ়িয়ামেই এই সাপের ফসিল সংরক্ষিত ছিল। পরে বিজ্ঞানীরা সেই ফসিলের সিটি স্ক্যান করেন। স্ক্যানে দেখা যায়, সাপটির শিরদাঁড়ার ৩১টি হাড়ের অংশ রয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ফসিলটির থ্রি-ডি ছবি তৈরি করা হয়।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সাপটির লেজের দিকের হাড়গুলি তুলনায় ছোট যা আধুনিক সাপের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই সাপটির দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ এক মিটার বা তিন ফুটের একটু বেশি ছিল। তবে সাপটি কী খেত, তা জানা যায়নি, কারণ ফসিলে মাথার অংশ পাওয়া যায়নি।
এই গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী, সরীসৃপ বিশেষজ্ঞ জর্জিও জর্জিয়ালিস বলেন, এই আবিষ্কার তাঁদের কাছে স্বপ্নের মতো। এতদিন আধুনিক সাপদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। এই ফসিল সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই কাছে এনে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই সাপটি দেখতে অনেকটা আজকের ‘এলিফ্যান্ট ট্রাঙ্ক স্নেক’-এর মতো হতে পারে, যাদের চামড়া ঢিলেঢালা এবং যারা মূলত জলে থাকে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রজাতির সাপও জলেই বেশি থাকত। তবে মাথার অংশ না পাওয়ায় নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
এখন বিজ্ঞানীরা এই ফসিলটির তুলনা করতে চাইছেন আরেকটি বিলুপ্ত সাপের প্রজাতি— ‘প্যালিওফিস’-এর সঙ্গে। কারণ দুই প্রজাতিই প্রায় একই সময়ে, অর্থাৎ ইওসিন যুগে, এবং একই অঞ্চলে আজকের ব্রিটেন এলাকায় বাস করত।
