লোকদেবতা দক্ষিণ রায় থেকে দক্ষিণেশ্বর: বিশ্বাস বদলালেও রয়ে গেছে ভরসা
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- সুন্দরবনের লোকবিশ্বাসে দক্ষিণ রায় বহু শতাব্দী ধরে বাঘ ও অরণ্যের দেবতা হিসেবে পূজিত। বনজীবী মানুষের কাছে তিনি বাঘের হাত থেকে রক্ষাকর্তা, জীবিকা ও জীবনের নিরাপত্তার প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই লোকদেবতাই বৃহত্তর হিন্দু সমাজে ‘দক্ষিণেশ্বর’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। এই নামবদল বা রূপান্তর কেবল ধর্মীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লোকধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস।
সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ধপধপি, মাতলা সহ একাধিক জায়গায় আজও দক্ষিণ রায়ের পূজা হয়। বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচার আশাতেই প্রাচীনকাল থেকে তাঁর আরাধনা চলে আসছে। লোকমুখে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী ‘দক্ষিণ রায়’ নামটি ধীরে ধীরে বদলে ‘দক্ষিণেশ্বর’ হয়ে ওঠে। তবে গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সামাজিক স্বীকৃতি ও ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার হরিনারায়ণপুর এলাকা দক্ষিণবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র। এখানে খননের সময় মাটির বাসন, পোড়ামাটির মূর্তি, তামার মুদ্রা, পুঁতি-সহ নানা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন মিলেছে। এখান থেকেই উদ্ধার হওয়া একটি মুণ্ডমূর্তি গবেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। তাঁদের একাংশের মতে, এই মূর্তিই লোকসমাজে পরিচিত বারামূর্তির আদিরূপ।
শাস্ত্রীয় হিন্দু ধর্মে দক্ষিণ রায়ের পূজার কোনও নির্দিষ্ট বিধান নেই। তবু দক্ষিণবঙ্গের ব্রাহ্মণ সমাজ তাঁকে ‘দক্ষিণেশ্বর’ নামে গ্রহণ করে। গোপন মন্ত্রে তাঁর পূজা করা হয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ করা হয় না। এই গ্রহণযোগ্যতা ব্যাখ্যা করতে দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের যোগসূত্র খোঁজা হয়েছে। কেউ তাঁকে শিবের ক্ষেত্রপাল রূপে দেখেন, কেউ আবার গণেশের সঙ্গে যুক্ত করেন।
লোকদেবতাদের শাস্ত্রীয় কাঠামোয় আনার এই প্রবণতা নতুন নয়। বাংলায় শীতলা, মনসা, ধর্মঠাকুরের মতো অনেক দেবতাই একসময় লোকবিশ্বাসে সীমাবদ্ধ ছিলেন। পরে তাঁরা ধীরে ধীরে বৃহত্তর হিন্দু সমাজে জায়গা করে নেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে একদিকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণও সহজ হয়েছে।
দক্ষিণ রায়ের উল্লেখ রয়েছে কৃষ্ণরাম দাস রচিত ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যে। সেখানে দক্ষিণ রায় ও গাজী পীরের দ্বন্দ্বের কাহিনি পাওয়া যায়। কোনও কোনও আখ্যানে দক্ষিণ রায়কে রাজা মুকুট রায়ের সেনাপতি হিসেবেও দেখা যায়। এই সব কাহিনিকে ঘিরেই দক্ষিণ রায়ের মানবমূর্তি ও বারামূর্তির ব্যাখ্যা গড়ে উঠেছে।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী দক্ষিণ রায়ের আদিরূপ ছিল ব্যাঘ্ররূপ বা বারামূর্তি। জঙ্গল দখল বা চাষের সময় বাঘের ভয় থেকে মুক্তি পেতেই এই রূপে তাঁর পূজা করা হতো। বারামূর্তিতে পুরুষ ও নারী—দুই মূর্তির উপস্থিতি একে পূর্বপুরুষ বা বাস্তুদেবতা পূজার সঙ্গে যুক্ত করে। গবেষকদের মতে, কান্ডহীন মুণ্ড আদিম সমাজের বিশ্বাস ও জাদুচর্চার প্রতীক।
অন্যদিকে দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও মূর্তি তুলনামূলকভাবে আধুনিক। মন্দিরের গঠনে ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়। মূর্তিতে বন্দুকের মতো আধুনিক অস্ত্র এবং পোড়া শোল মাছের প্রসাদ এই দেবতার লোকজ চরিত্রের আধুনিক রূপকেই তুলে ধরে।
দক্ষিণ রায় ও বারামূর্তি এক কিনা, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য, সাহিত্য ও লোকবিশ্বাস বিশ্লেষণ করে গবেষকদের একাংশ মনে করেন, বারামূর্তি অনেক বেশি প্রাচীন। আর দক্ষিণেশ্বর হল সেই আদি লোকদেবতার পরবর্তী, শাস্ত্রসম্মত রূপ।
বিশ্বাসের রূপ বদলালেও সুন্দরবনের মানুষের ভয় ও ভরসার জায়গা যে একই রয়ে গেছে, তা স্পষ্ট।
