জাগ্রত মা রটন্তী—শক্তি, সাধনা ও শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- রাজ্যের অন্যতম শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত পূর্ব বর্ধমানের গুসকরা। অজয়ের শাখা নদী কুনুরের তীরে অবস্থিত এই জনপদের বুকেই বিরাজ করছেন জাগ্রত মা রটন্তী কালী। লোকবিশ্বাস ও তন্ত্রসাধনার ইতিহাসে ঘেরা এই মন্দির শুধু ধর্মীয় আস্থার কেন্দ্র নয়, এক গভীর ঐতিহ্যের ধারকও বটে।
কথিত আছে, আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে গুসকরা গ্রামের এক প্রাচীন শ্মশানে তন্ত্রসাধনায় লিপ্ত ছিলেন সিদ্ধতান্ত্রিক সাধক রতনেশ্বর বাবা। সেই শ্মশানেই তিনি নিজের হাতে পঞ্চমুণ্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে শুরু হয় মা রটন্তী কালীর আরাধনা। আজও মন্দির প্রাঙ্গণের উত্তর দিকে রয়েছে সাধক রতনেশ্বর বাবার সমাধি, যা ভক্তদের কাছে গভীর শ্রদ্ধার স্থান।
মন্দিরের গর্ভগৃহে পঞ্চমুণ্ডির আসনের উপর উঁচু বেদিতে চতুর্ভুজা দেবী রটন্তী কালী শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। এই মূর্তিরূপেই দেবীর দর্শন মেলে। প্রতিবছর মাঘ মাসের রটন্তী চতুর্দশীতে খড় ও মাটি দিয়ে নতুন করে দেবীর বিগ্রহ নির্মাণ করা হয়। রটন্তী কালীপুজো শুরু হয় সেই দিন থেকেই এবং টানা সাত দিন ধরে বিশেষ নিয়মে পুজো চলে। পুজো শেষে দেবীকে বিসর্জন দেওয়া হয় পাশের কুনুর নদীতে।
তবে এখানেই শেষ নয় রীতির পর্ব। বিসর্জনের পরে নদীর জলে দেবীর গা থেকে মাটি ধুয়ে গেলে কাঠামোটি আবার মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানে নতুন করে মাটি দিয়ে দেবীর বিগ্রহ ও মহাদেবের মুখমণ্ডল গড়া হয়। এরপর কাঠামোর বাকি অংশে কাপড় পরিয়ে বছরভর দেবীর নিত্যপুজো চলে—যা এই মন্দিরের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
সাধক রতনেশ্বর বাবার প্রয়াণের পর মন্দিরের দায়িত্বভার গ্রহণ করে গুসকরার ঐতিহ্যবাহী চোংদার পরিবার। আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পরিবারই নিষ্ঠার সঙ্গে মা রটন্তী কালীর সেবাপুজো চালিয়ে আসছে। স্থানীয়দের মতে, চোংদার পরিবারেরই এক তন্ত্রসাধক সদস্য প্রথম দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই কালীপুজো আসলে তাঁদের পারিবারিক পুজো থেকেই শুরু।
রটন্তী কালীপুজোর পাশাপাশি প্রতি অমাবস্যায় এই মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। এছাড়াও দীপান্বিতা কালীপুজোয় মন্দির চত্বরে হয় বিপুল আয়োজন। সেই সময় দুশো থেকে আড়াইশো ছাগ বলি হয় বলে জানা যায়, যা এই পুজোর তন্ত্রাচারের দিকটি স্পষ্ট করে।
শতাব্দীপ্রাচীন সাধনা, লোককথা আর আচার-অনুষ্ঠানের মিলনে গুসকরার মা রটন্তী কালী আজও ভক্তদের কাছে জাগ্রত শক্তির প্রতীক। বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের এই ধারাবাহিকতাই গুসকরাকে দিয়েছে এক অনন্য ধর্মীয় পরিচয়।
