কে এই ‘কালী’? যাঁর ইশারায় নড়ত পুরসভার ফাইল!
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতাঃ “কালীকে তুললে সব বেরিয়ে যাবে।”— তারাতলার ভয়াবহ বহুতল বিপর্যয়ের পর বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই একটি মন্তব্যেই তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। আর এই বিবৃতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ তথা ‘সিট’ আটক করে কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে কালীকে। কোনো নেতা বা মন্ত্রী নন, স্রেফ একজন সরকারি আধিকারিক হয়েও কীভাবে কলকাতা পুরনিগমের অন্দরে তিনি ‘মুকুটহীন সম্রাট’ হয়ে উঠলেন, তা নিয়ে এখন চারদিকে জোর চর্চা।
কে এই কালীচরণ? নজরকাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা
কলকাতা পুরসভার অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়, এই কালীচরণের ইশারা ছাড়া নাকি সেখানে একটা পাতাও নড়ত না। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ‘চোখ’ হিসেবেই দেখা হতো তাঁকে। তবে কর্মজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এই আধিকারিক।
-
২০০৩: রেভিনিউ সার্ভিসে যোগ দেন।
-
২০০৬: ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন।
-
২০০৮: পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়ে পুলিশ বিভাগে যোগ দেন।
-
২০০৯: মিউনিসিপাল সার্ভিস কমিশনের ডেপুটি ম্যানেজারের পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে কলকাতা পুরনিগমের ৯ নম্বর বরোতে যোগ দেন।
যেভাবে ফিরহাদ হাকিমের ‘গুড বয়’ হয়ে ওঠা
২০০৯ সালে কালীচরণ যখন পুরসভার ৯ নম্বর বরোতে আসেন, তখন সেখানকার চেয়ারম্যান ছিলেন ফিরহাদ হাকিম। জানা যায়, তখন থেকেই ফিরহাদ হাকিমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ‘গুড বয়’ হিসেবে নিজেকে তৈরি করেন কালীচরণ। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ফিরহাদ হাকিম যখন কলকাতার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পান, তখন তিনি কালীচরণকে নিজের ওএসডি পদে বসান। এরপর থেকে মেয়রের কাছে পৌঁছানো প্রতিটা ফাইল যেত এই কালীর হাত ধরেই।
শুভেন্দু অধিকারীর বিস্ফোরক অভিযোগ
বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কালীর বিরুদ্ধে একাধিক মারাত্মক অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি: ১. কালী না বললে কলকাতা পুরসভায় কোনও বিল্ডিং প্ল্যানে অনুমোদন হতো না। ২. এই কালী আসলে ‘ক্যামাক স্ট্রিট’ (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তর)-এর অ্যাপয়েন্ট করা লোক। ৩. বাইপাসের ধারে ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে যে তৃণমূল ভবন তৈরি হচ্ছে, তার পেছনেও রয়েছে এই কালী। এখান থেকেই টাকা তুলে পাঠানো হতো।
“আমি কোথা থেকে এর মধ্যে এলাম?”— দাবি কালীর
দিনভর এই বিতর্ক ও আটক হওয়ার ঠিক আগে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের ক্ষোভ উগরে দেন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, “বলা হচ্ছে, কালী ছাড়া নাকি কোনও প্ল্যান স্যাংশন হত না। আমি নাকি ক্যামাক স্ট্রিটের লোক। আমি নাকি তৃণমূল ভবনের ২০০ কোটি টাকা তুলেছি। আমি কোথা থেকে এর মধ্যে এলাম, কী করে জানব!”
ক্যামাক স্ট্রিট তত্ত্ব নিয়ে পাল্টা দাবি ফিরহাদ ও কুণালের
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কালীকে ‘ক্যামাক স্ট্রিটের লোক’ বলে দাবি করলেও, এর উলটো সুর শোনা গিয়েছে তৃণমূল শিবিরের অন্দরেই। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, ক্যামাক স্ট্রিট আসলে কালীর বিরোধীই ছিল। অন্যদিকে, বিধায়ক কুণাল ঘোষও দাবি করেছেন, একসময় এই কালীচরণকে পুরসভার ওএসডি পদ থেকে সরাতেই চেয়েছিল ক্যামাক স্ট্রিট।
তারাতলা বিপর্যয়ের তদন্তে এই হাইপ্রোফাইল আধিকারিকের গ্রেফতারি বা আটক হওয়া কলকাতার পুর-প্রশাসন ও শাসক দলের অন্দরে আরও বড় কোনও বিস্ফোরক তথ্য সামনে আনে কি না, এখন সেটাই দেখার।
