আজকের দিনেতিলোত্তমা

সংগঠন বাঁচাতে পুরনো সেনাপতিদের ওপরই ভরসা মমতার

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতা: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে নজিরবিহীন বিপর্যয়। ২৯৪টি আসনের মধ্যে মাত্র ৮০টি ঘাসফুল শিবিরের ঝুলিতে এলেও, তার সিংহভাগ বিধায়কই এখন প্রকাশ্য বিদ্রোহী। ‘দিদি’র সঙ্গ ছেড়ে ইতিমধ্যে ৬৫ জন বিধায়ক যোগ দিয়েছেন ‘ভালো তৃণমূলে’। লোকসভাতেও দল কার্যত ছারখার। দলের অন্দরে এই নজিরবিহীন টানাপোড়েন ও তীব্র বিদ্রোহের আবহেই এবার ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংগঠনকে নতুন করে অক্সিজেন দিতে এবং কর্মীদের ভাঙা মনোবল চাঙ্গা করতে জেলা ও সাংগঠনিক স্তরে বড়সড় রদবদল করল তৃণমূল কংগ্রেস। ​রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, চরম সংকটের এই মুহূর্তে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং চরম অনুগামী নেতৃত্বের ওপরই আস্থা রেখেছেন নেত্রী।

কলকাতা ও শহরতলিতে বড় রদবদল
​নতুন এই সাংগঠনিক কমিটি অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় চমক উত্তর কলকাতায়। উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কুণাল ঘোষকে। দলের এই চরম অস্বস্তির সময়েও যেভাবে তিনি ‘দিদি’র পাশে দাঁড়িয়ে লড়াকু মেজাজে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তারই পুরস্কার হিসেবে এই পদ প্রাপ্তি বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। অন্যদিকে, দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতির পদে দেবাশিস কুমারের জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে।

জেলায় জেলায় পুরনো চাল ভাতে
​দলীয় অন্দরের সমীকরণ মেলাতে জেলা স্তরেও একাধিক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে:
হুগলি-শ্রীরামপুর: শ্রীরামপুর-হুগলি সাংগঠনিক জেলায় ফের আস্থা রাখা হয়েছে প্রবীণ নেতা অসিত মজুমদারের ওপর। উল্লেখ্য, নির্বাচনে তাঁর বদলে দেবাংশু ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করায় অভিমানী অসিত মুখ খুলেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে হারের পর দেবাংশু নেত্রীর সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করায়, ফের অসিতেই ভরসা রাখল দল।
​হাওড়া ও ব্যারাকপুর: ব্যারাকপুরে ‘বিদ্রোহী’ পার্থ ভৌমিকের বদলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অমিত গুপ্তকে। বড় রদবদল হয়েছে হাওড়া সদরেও। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিধায়ক অরূপ রায়, যিনি বর্তমানে ঋতব্রতদের শিবিরে নাম লিখিয়েছেন, তাঁকে সরিয়ে সভাপতি করা হয়েছে প্রাক্তন মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
বর্ধমান ও উত্তরবঙ্গ: পূর্ব বর্ধমানের দায়িত্বে আনা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়কে এবং পশ্চিম বর্ধমানের সভাপতি করা হয়েছে নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে। উত্তরবঙ্গে জমি পুনরুদ্ধার করতে দার্জিলিং জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান পদে ফেরানো হয়েছে অভিজ্ঞ গৌতম দেবকে।
এক নজরে নতুন জেলা নেতৃত্ব:
উত্তর কলকাতা: কুণাল ঘোষ
​দক্ষিণ কলকাতা: বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়
​শ্রীরামপুর-হুগলি: অসিত মজুমদার
​ব্যারাকপুর: অমিত গুপ্ত
​হাওড়া সদর: রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়
​পূর্ব বর্ধমান: রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়
​পশ্চিম বর্ধমান: নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
​দার্জিলিং: গৌতম দেব

​অস্তিত্ব সংকটে দলীয় কার্যালয়ও!
​সংগঠন যখন খাদের কিনারায়, তখন এই নতুন কমিটি প্রকাশের নেপথ্যে উঠে এসেছে এক চরম বিড়ম্বনার তথ্য। যে দলীয় কার্যালয়ের ঠিকানা থেকে এই নতুন কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, খোদ সেই বাড়ির অস্তিত্বই এখন প্রশ্নের মুখে। বাড়ির মালিক মন্টু সাহা ইতিমধ্যেই আইনিভাবে সেই বাড়ির দখল ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছেন। ফলে ঘর গোছানোর এই মরিয়া চেষ্টার মাঝেই আক্ষরিক অর্থেই ‘ঠিকানা’ হারানোর আশঙ্কায় ভুগছে ঘাসফুল শিবির।
​তৃণমূল পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মুহূর্তে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সামনে হিমালয়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিদ্রোহীদের সামলানো, আর অন্যদিকে সাধারণ কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করে সবাইকে এক ছাতার তলায় এনে নতুন করে লড়াইয়ের ময়দান প্রস্তুত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য এই নতুন কমিটির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *