গ্রেপ্তারের পর কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তায় ঘোরানো কেন? রাজ্যের কাছে রিপোর্ট তলব কলকাতা হাই কোর্টের
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা:- রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর একাধিক অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর ঘটনায় কড়া অবস্থান নিল কলকাতা হাই কোর্ট। পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে শুক্রবার রাজ্যের কাছে চার সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট চাইল বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত ও বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ।
বিগত দুই সপ্তাহে উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় অভিযুক্তকে থানা থেকে কোমরে মোটা দড়ি পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর ঘটনা সামনে এসেছে। কোনও ক্ষেত্রে আদালতে হাজির করানোর সময়, আবার কোথাও থানা থেকে বের করার সময়ই পুলিশ এই পদ্ধতি নিচ্ছে। সাধারণ মানুষ সেই দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। জলপাইগুড়ি, মালদা, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক ঘটনা ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার কর্মীদের একাংশের দাবি, অভিযুক্ত হলেও আইনের চোখে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে এভাবে প্রকাশ্যে অপমান করা যায় না। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার দেয়। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়েও বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। এই ইস্যুতে পুলিশের ভূমিকা ও পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলে কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। শুক্রবার মামলার শুনানিতে বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত বলেন, “পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারে। আইন মেনে তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপও করতে পারে। দোষ প্রমাণিত হলে তাঁকে ফাঁসিতেও চড়াতে পারে। কিন্তু গ্রেপ্তারের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে অভিযুক্তদের সম্মানহানি করতে পারে না।”
আদালত স্পষ্ট জানায়, আসামি বা অভিযুক্তের ওপর রাগ বা বিক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু আসামিকে অপমান করা কাম্য নয়। সংবিধানও তা সমর্থন করে না। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, এইভাবে কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানোয় ওই ব্যক্তিদের সামাজিক সম্মানহানি হচ্ছে। পরিবারের উপরও এর প্রভাব পড়ছে। পুলিশি হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্বও পুলিশের। ইচ্ছাকৃতভাবে যেন এমনটা না করা হয়, সেই বার্তাও দিয়েছে আদালত। রাজ্যের আইনজীবী আদালতে জানান, অনেক সময় অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করে বলে নিরাপত্তার খাতিরে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে আদালত পাল্টা প্রশ্ন তোলে, হাতকড়ার বদলে কোমরে দড়ি কেন? পুলিশ ম্যানুয়ালে এমন কোনও নির্দেশ আছে কি না, তাও জানতে চেয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।
রাজ্যের তিন-চারটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে হাই কোর্ট আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যকে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। রিপোর্টে পুলিশ কেন এই পদ্ধতি নিচ্ছে, এর আইনি ভিত্তি কী এবং ভবিষ্যতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা জানাতে হবে। হাই কোর্টের নিয়মিত বেঞ্চে এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। আদালতের এই হস্তক্ষেপের পর রাজ্য পুলিশের এই বিতর্কিত প্রথায় রাশ টানা হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
