পথকুকুর মামলায় পুরনো রায়েই অনড় সুপ্রিম কোর্ট: মানুষের সুরক্ষাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, দিল্লি:- দেশজুড়ে পথকুকুরের ক্রমবর্ধমান উপদ্রব এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে এক নজিরবিহীন ও কঠোর অবস্থান নিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। পথকুকুর সংক্রান্ত নিজেদের পূর্ববর্তী রায় সংশোধনের দাবিতে কুকুরপ্রেমী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার করা একগুচ্ছ আবেদন একঝটকায় খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি এনভি আঞ্জারিয়ার তিন বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— “কুকুরের কামড় খাওয়ার ভয় ছাড়া বেঁচে থাকার অধিকারও সংবিধানে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকারের মধ্যে পড়ে।” আদালত তার আগের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে স্পষ্ট জানিয়েছে, মানুষের জীবন রক্ষা করা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। এই বাস্তব পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।
১. হিংস্র ও জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুরদের ‘নিষ্কৃতি মৃত্যু’র অনুমতি
আইনি খবর পরিবেশনকারী ওয়েবসাইট ‘বার অ্যান্ড বেঞ্চ’ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আদেশে কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চরম রোগাক্রান্ত বা হিংস্র কুকুরদের ক্ষেত্রে ‘ইউথেনেসিয়া’ বা স্বেচ্ছামৃত্যু/নিষ্কৃতি মৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, যে সব এলাকায় পথকুকুরের সংখ্যা উদ্বেগজনক এবং ঘন ঘন মানুষ কামড়ের শিকার হচ্ছেন, সেখানে বিশেষজ্ঞরা পশুদের উপর নিষ্ঠুরতা দমন আইন ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ বিধি মেনে পাগল হয়ে যাওয়া বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত অত্যন্ত আক্রমণাত্মক কুকুরদের মেরে ফেলতে বা নিষ্কৃতিমৃত্যু দিতে পারবেন।
২. পাবলিক প্লেস থেকে কুকুর অপসারণ
২০২৫ সালের নভেম্বরে আদালত যে নির্দেশ দিয়েছিল, এবারও সেই সিদ্ধান্তে অনড় রইল শীর্ষ আদালত। নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:
-
স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য জনবহুল প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা থেকে সমস্ত পথকুকুরকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।
-
বন্ধ্যাকরণ বা টিকাকরণের জন্য এই সমস্ত পাবলিক প্লেস থেকে যে কুকুরদের নিয়ে যাওয়া হবে, তাদের আর কোনওভাবেই সেই পুরনো জায়গায় ফিরিয়ে আনা বা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অপসারিত এই কুকুরদের নির্দিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. রাজ্যগুলির ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও ‘আদালত অবমাননা’র হুঁশিয়ারি
শুনানির সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কুকুরের কামড়ের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান দেখে রাজ্য সরকারগুলির দূরদর্শিতার অভাব নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। বিশেষ করে পঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেয় আদালত।
বেঞ্চ মন্তব্য করে, কোনো সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়াই এতদিন বন্ধ্যাকরণ এবং টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়েছে। আদালত সাফ জানিয়েছে, সমস্ত রাজ্যকে পশু জন্ম নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে, অন্যথায় সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিরুদ্ধে সরাসরি আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে।
৪ প্রতি জেলায় এবিসি কেন্দ্র ও ভ্যাকসিনের নির্দেশ
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে পশু জন্মনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। যেখানে প্রশিক্ষিত পশুচিকিৎসক, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টি-রেবিস ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
৫. আইজিআই বিমানবন্দর ও সুরাতের ঘটনার উল্লেখ
আদালত শুনানির সময় সাম্প্রতিক কিছু মারাত্মক ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। দেশের অন্যতম ব্যস্ত দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘন ঘন কুকুরের কামড়ের ঘটনাকে ‘গুরুতর প্রশাসনিক দক্ষতাহীনতা’ বলে উল্লেখ করে বেঞ্চ। পাশাপাশি গুজরাতের সুরাতে এক জার্মান পর্যটককে পথকুকুরের কামড়ে জখম করার ঘটনাটিও তুলে ধরা হয়। আদালত মনে করিয়ে দেয়, শিশু, বয়স্ক ও পথচারীরাই এই উপদ্রবের সবচেয়ে বড় শিকার, যা প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
গত ২৯ জানুয়ারি এই মামলার রায়দান স্থগিত রাখার পর, মঙ্গলবার চূড়ান্ত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার বার্তা দিল— রাস্তাঘাটে বা সর্বসাধারণের জায়গায় কুকুর ঘুরে বেড়ানো ‘উদ্বেগজনক’। আর এই পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণী বা পশুপ্রেমের চেয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই আইনিভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
