মায়ের চিতার পাশে মেয়ের অঙ্ক পরীক্ষা
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- একমাত্র কন্যা, মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী নন্দিনী বর্মনের জীবনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটল সোমবার। দুর্গাপুরের ভুপালচন্দ্র বিদ্যাপীঠের ওই শিক্ষার্থী চার দিনের কঠোর প্রস্তুতির মধ্যেই পরীক্ষা দিতে চলেছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে ঘটে গেল এমন ঘটনা, যা যে কোনো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।
সোমবার ভোর চারটায় রায়গঞ্জের একটি নার্সিংহোমে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নন্দিনীর মা, রেখা বর্মন। মায়ের অসুস্থতার খবর নন্দিনী জানতেন, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরুর মুহূর্তে এমন আকস্মিক মৃত্যু তাঁর জন্য এক মর্মান্তিক ধাক্কা। মর্মাহত কন্যা নন্দিনী সেই খবর পেয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়েন। কান্নায় ভেঙে পড়লেও পরীক্ষা দিতে তার বাধ্যবাধকতা ছিল অপরিবর্তিত।
পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছার আগে নন্দিনী বাড়ি থেকে নার্সিংহোমে ছুটে গিয়ে মায়ের পায়ে প্রণাম করেন। চোখের জল মুছতে মুছতে, পরিবারের সাহায্যে তিনি নিজের মনকে দৃঢ় করে নির্ধারিত পরীক্ষাকক্ষে পৌঁছান। তিনি জানতেন, এই পরীক্ষা শুধু শিক্ষার জন্য নয়, বরং নিজের মনোবল পরীক্ষা করারও একটি মুহূর্ত।
গণিত পরীক্ষার সময় নন্দিনী নিজের মনকে ধরে রাখলেও, মায়ের কথা মনে পড়লেই কলম থেমে থেমে যাচ্ছিল তার। কিছু সময় তিনি লিখতে লিখতে হঠাৎ থমকে যান, চোখের জলের ফোঁটা যেন উত্তরপত্রে পড়ে যাচ্ছে। তবে কেন্দ্রের পরীক্ষকরা তাঁর পাশে থেকে সহায়তা দেন। সেই সাহচর্য ও নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তিন ঘণ্টার পরীক্ষা শেষ করেন নন্দিনী।
পরীক্ষার পরে বাড়ি ফেরার পথে তিনি নিজের মায়ের দেহকে ঘিরে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেসে যান। একমাত্র কন্যা হিসেবে পরিবারের সঙ্গে তিনি মায়ের মুখাগ্নি সম্পন্ন করেন। স্থানীয়রা জানান, শায়িত মায়ের দেহে আগুন জ্বলতে শুরু করার সময়ও তিনি তার পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে থাকেন, কান্নায় ভেসে যান। বাবা শ্যামল বর্মন বলেন, “মৃত্যুর আগে স্ত্রী আমাদের বলেছিল, মুখাগ্নি কন্যাই করবে। তাই মেয়ের জন্য এটাই একমাত্র দায়িত্ব।”
এই ঘটনা শুধু এক পরীক্ষার নয়, বরং এক কন্যার সাহস, দৃঢ়তা এবং মায়ের প্রতি নিঃশেষ শ্রদ্ধার প্রতীক। তবে মন খারাপের বিষয়, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা কেউ মায়ের মৃত্যু ও পরীক্ষার্থী কন্যার পাশে উপস্থিত ছিলেন না।
নন্দিনী এই ঘটনায় প্রমাণ করলেন, মানসিক যন্ত্রণার মধ্যেও একজন সন্তান কীভাবে দায়িত্বশীল থাকতে পারে এবং নিজের কর্তব্য পালন করতে পারে। মায়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে পরীক্ষায় বসা এই দৃশ্য সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
