বীরভূমেই কেদারের ছোঁয়া
বীরভূমের লালমাটির বিস্তারে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। সমতল বাংলার বুক চিরে উঠে দাঁড়ায় পাথরের স্তূপ, আকাশ ছুঁতে চাওয়া শিলাখণ্ড, আর তারই কোলে আধ্যাত্মিকতার নিবিড় আশ্রয় মনে পড়ে যায় দূরের হিমালয়, মনে পড়ে কেদারনাথ মন্দির। অথচ এ পথ ধরলে যেতে হয় না উত্তরাখণ্ডে আমাদেরই বীরভূম জেলা।
দুবরাজপুর শহর ছাড়িয়ে যত এগোনো যায়, ততই শহুরে শব্দ মিলিয়ে যায়। সামনে ধরা দেয় মামা-ভাগ্নে পাহাড় প্রকৃতির এক অদ্ভুত ভাস্কর্যশালা। বিশাল পাথরগুলো যেন যুগের পর যুগ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব সাক্ষী; কারও আকার গোল, কারও তীক্ষ্ণ, কোথাও বা ভারসাম্যের আশ্চর্য খেলা। দুপুরে রোদে তারা দগ্ধ, বিকেলে তারা রাঙা, আর সন্ধ্যায় তারা ছায়ার মতো গম্ভীর।
এই প্রস্তরপ্রান্তরের পাদদেশেই ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পাহাড়েশ্বর শিব মন্দির যেন পাহাড়ের হৃদয়ে মানুষের প্রার্থনার স্থায়ী ঠিকানা। দূর থেকেই তার উচ্চতা চোখে পড়ে, কিন্তু কাছে এলে বোঝা যায় তার সূক্ষ্মতা।
প্রবেশদ্বার যেন এক প্রতীকী যাত্রার শুরু। ঘণ্টার আদলে খোদাই শব্দহীন ধ্বনি; প্রদীপের নকশা আলো জ্বালানোর আহ্বান; আর মাঝখানে তৃতীয় নয়ন অন্তরের অন্ধকার ভাঙার প্রতীক। উপরে গণেশ, যেন সমস্ত বাঁধা পেরোনোর আশ্বাস দিয়ে দর্শনার্থীকে ভিতরে ডাকেন।
মন্দিরচত্বরে ঢুকলেই বদলে যায় পরিবেশ। পাথুরে জমির উপর ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে গম্বুজ পদ্মফুলের মতো প্রসারিত। প্রতিটি পাপড়ির মাঝে ক্ষুদ্র শিবলিঙ্গ, যেন অসংখ্য প্রার্থনার বিন্দু একত্রে জুড়ে তৈরি করেছে স্থাপত্য। উপরে মহাদেব, তারও উপরে ‘ওঁ’ সৃষ্টির ধ্বনি; তারপর ত্রিশূল ও নাগ শক্তি ও সুরক্ষার প্রতীক; আর শীর্ষে পদ্মকুঁড়ি নবজন্মের ইঙ্গিত।
ভোরে সূর্যের প্রথম আলো পড়লে মন্দিরের গায়ে সোনালি আভা নামে। দুপুরে চারপাশের পাথর থেকে প্রতিফলিত তাপ এক রুক্ষ সৌন্দর্য তৈরি করে। বিকেলে লাল আকাশে গম্বুজের রেখা যেন ছবি হয়ে যায়। আর সন্ধ্যারতি তখন ঘণ্টাধ্বনি পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়, ধূপের গন্ধ বাতাসে মেশে, আর মনে হয় নীরবতাই এখানে সবচেয়ে বড় মন্ত্র।
শিবরাত্রিতে এখানে মানুষের ঢল নামে ভক্তি, আরতি, প্রার্থনা আর মেলার আবহে ভরে ওঠে চারদিক। তবে নির্জন দিনগুলোতেই এই স্থান সবচেয়ে গভীর তখন শুধু হাওয়া, পাথর আর মন একসঙ্গে কথা বলে।
দুবরাজপুর রেলস্টেশন থেকে খুব অল্প পথ টোটো বা গাড়িতে পৌঁছনো যায় সহজেই। কিন্তু পথের দৈর্ঘ্য যত ছোট, অনুভূতির পথ তত দীর্ঘ। এখানে এসে বোঝা যায়, আধ্যাত্মিকতা সবসময় দূরের পাহাড়ে থাকে না কখনও সে নিজের মাটির মধ্যেই জন্ম নেয়। তাই বীরভূমে দাঁড়িয়েও মনে হয়, কেদার খুব দূরে নয় শুধু অনুভবের দূরত্বটুকুই পেরোতে হয়।
